জীবনের যে বাস্তবতার ব্যাপারে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নিশ্চিত তা হচ্ছে মৃত্যু। আমার জীবনযাত্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে দায়িত্ব পালনের জন্য ছুটে বেড়ায় এখান থেকে ওখানে। দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরে চোখ দুটো বন্ধ করে চলে যাই ঘুমের জগতে।
আমরা কি ঘুম থেকে চোখ দুটো খুলতে পারবো?
ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের সব চিন্তা দুশ্চিন্তা সেই ভবিষ্যৎকে আমাদের কাছে ধরা দেবে। একদিন পরিবারের কোন সদস্য বা কাছের কোন মানুষ চোখ বন্ধ করে দিল আর খুলতে পারল না। আপনি হতভম্ব হয়ে গেলেন যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না সে মানুষটা সত্যি সত্যি চিরতরে আপনার কাছ থেকে চলে গেছে। অন্তত যেন অবশ হয়ে গিয়েছে। মরদেহটা কে গোসল করানো হলো দাফন করা হলো যে মানুষটিকে ধরে ডাকতেন বাবা বলতেন মা বলতেন কত আদরের নাম ধরে ডাকতেন সেই মানুষটাকে আজ সবাই লাশ বলে সম্বোধন করছে।
লাশ কাঁধে নিয়ে আপনি হাতে দিলেন কবরস্থানের পানে কবর খোড়া হয়ে গিয়েছে লাশ কবরে নামানোর জন্য কজন মিলে কবরে নেমে পড়লেন। বুকটা ধরফর করে উঠে। চার দিকে মাটি যেন চেপে ধরেছে। বাকিদের দেখে কিছুটা সাহস পেলেন লাশ কবরে নামিয়ে নিলেন। এবার আপন সেই মানুষটিকে সেই অন্ধকার গর্তে রেখে আপনার উঠে আসার পালা।
নিজ হাতে মাটি নিয়ে সেই মানুষটির উপর ফেললেন। সাদা কাপড়ে মাটি পড়তে থাকে পড়তে থাকে দেখতে দেখতে কবর ভরপুর হয়ে যায়। কারো কারো চোখে জল আপনি সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন আপনার মুখ শুকিয়ে গেছে। সেই কবরের দিকে তাকিয়ে আপনি যেন নতুন করে উপলব্ধি করলেন যে মানুষটা আপনাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে আপনি তারই পেছন পেছন ছুটে চলছেন। তিনি যেই জগতে প্রবেশ করেছেন আপনি না চাইলেও আপনাকে সেই জগতেই শীঘ্রই প্রবেশ করতে হবে। কেমন হবে সেই দিনটি ?
মৃত্যুবরণ করার অভিজ্ঞতাটা আসলে কেমন?
আল্লাহর অশেষ রহমত নিশ্চিত এই গন্তব্যের চিত্রটি তিনি তার রাসুল সাঃ এর মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। যেন আমরা সেই দিনটির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারি। বছরখানেক পার হয়ে গেল আপনি শুয়ে আছেন হাসপাতালে বিছানায় আপনার শ্বাস দুর্বল হয়ে আসছে আপনার মনে পড়ছে ছোটবেলার নানা স্মৃতি। মনে পড়ছে অর্জুন গুলো মনে পড়ছে ভুলগুলো। অনেক বেশি আফসোস হচ্ছে যে সময়টুকু অপচয় করেছিলেন তার জন্য। যতটুকু সময় বাকি আছে তা অপচয় করা যাবে না।
নিঃশব্দে ঠোঁটে নেড়ে আপনি স্মরণ করলেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। অন্তরে আপনি জিকির করতে থাকলেন চোখ দুটো ঘোলা হয়ে আসছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কাছের মানুষগুলো ছোটাছুটি করছে। কিন্তু আপনি তাদের স্পষ্ট দেখতে পারছেন না। বরং চোখের কোনে এক অদ্ভুত আলো ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে লাগলো। কি সুন্দর সেই আলো মনোরম চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। এই আলোরা আগে জ্বালিয়ে দিল না কেন? ধীরে ধীরে আপনার নাকে ভেসে আসলো এক নতুন ঘ্রাণ।
এটা কি ফুলের ঘ্রান নাকি কোন সুগন্ধি? এক অদ্ভুত ভালোলাগা আপনার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এবং আপনার সব শারীরিক কষ্ট দূর হয়ে যাচ্ছে। এরপর আপনাকে পুরোপুরি চমকে দিয়ে একদল মানুষ আপনার দিকে ভেসে আসে। কিন্তু কই ওরা তো মানুষ না তাদের মুখগুলো এত উজ্জ্বল যেন সূর্য কেউ হার মানায়। আপনার মনে পড়ে গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদিস এবং আপনি বুঝতে পারলেন এরাই হচ্ছে সেই ফেরেশতাদের দল যারা আপনাকে আপনার নতুন জগতে স্বাগত জানাতে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন পুরো ঘরটা ফেরেশতা নূর দিয়ে ভরে গেল।
আপনি যেদিকেই তাকাচ্ছেন শুধু অগণিত ফেরেশতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছেন না। এরপর একজন ফেরেশতা আপনার একদম কাছে এগিয়ে আসে। আপনি বুঝতে পারেন তিনিই হচ্ছেন মালেকুল মউত। মৃত্যুর ফেরেশতা। তিনি আপনার মাথার কাছে এসে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভরা কন্ঠে বলেন হে পবিত্র আত্মা আল্লাহর ক্ষমার জগতে আল্লাহর সন্তুষ্টি জগতে বেরিয়ে আসো। আপনি যদি এই আহবারের অপেক্ষায় করছিলেন জন্ম থেকে আপনি এত দ্রুত এত সহজে দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন যেন এক পাত্র থেকে আরেকটি পাত্রে পানি ঢালা হলো। এবং ফেরেশতাদের উচ্ছ্বাস দেখে আপনার মনে পড়ে গেল আপনার সন্তান জন্ম হওয়ার সময়টির কথা।
যখন শিশুটি জন্ম নিয়েছিল প্রতিটি মানুষের চোখ মুখ ভরা ছিলো উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসা। সবাই তাকে কোলে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। আজ আপনি যখন আপনার দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন সব ফেরেশতারা যেন ঠিক সেরকমই উচ্ছাসিত আপনাকে কোলে নেয়ার জন্য তারা প্রতিযোগিতা করতে লাগল। তারা আপনাকে এক স্বর্গীয় কাপড়ে আবরণ করে অপূর্ব সুন্দর সুগন্ধি লাগিয়ে দিয়ে আপনাকে নিয়ে চলল আসমানের পানে।
আপনি যেন আলোর বেঁকে আকাশ পাড়ি দিতে লাগলেন আপনাকে ঘিরে রয়েছে অগণিত ফেরেশতা। আকাশ দিয়ে ভ্রমণ করতে করতে আপনি বিভিন্ন ফেরেশতাদের দল পার হতে লাগলেন প্রতিটি ফেরেশতাদের দল আপনার পরিচয় জানতে চাইলো আর আপনার আশেপাশে থাকা ফেরেস্তারা আপনার নাম বললো এবং সেই সাথে আপনাকে পৃথিবীতে যত ভালো ভালো ডাবে ডাকা হয়েছিল সেই নামে তারা বাকিদের কাছে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলো।
কেমন হবে আপনার মৃত্যু?
আপনি এমন সব দৃশ্য এমন সব সৃষ্টি দেখতে লাগলেন যে আল্লাহর প্রশংসা ছাড়া আর কোন কথাই আপনার মুখে আসছিল না। এ জগত এত প্রকাণ্ড এত বিচিত্র পৃথিবীতে থাকতে যেটাকে আপনি আধুনিক প্রযুক্তি ভেবেছিলেন সেই আধুনিক প্রযুক্তিতে এ জগতের অণু পরিমাণ বাস্তবতাও কখনো তুলে ধরতে পারেনি। ভাষা হারিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে আপনি সব দেখতে লাগলেন এবং অবশেষে আপনাকে নিয়ে ফেরেশতারা পৌঁছে যায় সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রান্তে।এরপর আপনার অন্তর যেন কেঁপে উঠল কারণ আপনি সারা জীবন যেই সত্তার কাছে আপনার মনের সব আকাঙ্ক্ষা গুলো বলে এসেছিলেন যে সত্তা তার অসীম রহমত এবং ভালোবাসার মাধ্যমে আপনার সাথে কথা বলেছিল আজ সেই মহান রব্বুল আলামীনের কন্ঠ আপনি সরাসরি শুনতে পেলেন।
এবং তিনি আপনার প্রশংসা করে অসীম মমতা ভরা কন্ঠে বললেন আমার আব্দের বই ইল্লিনে উঠিয়ে রাখো। আর তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দাও। আমি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তাকে মাটিতেই ফিরিয়ে দিচ্ছি এবং একদিন তাকে আবারও সেই মাটি থেকেই বের করে আনব। আল্লাহর কণ্ঠ শুনে আপনার মত পাপী বান্দার প্রতি তার যে দয়া এবং ভালোবাসা সুস্পষ্ট প্রকাশ পেলেও তা শুনে আপনার পুরো সত্তা যেন অপার উল্লাসে আলোকিত হয়ে উঠল। ৩০ টাকা আপনাকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিতে লাগলো কিন্তু আপনি যেন আপনার রবের সেই মায়া ভরা কন্ঠ ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভাবতে পারছেন না। অবশেষে আপনি ফিরে এলেন দুনিয়াতে এবং দেখলেন আপনার মরদেহ ততক্ষণে কবরে শুনিয়ে দেয়া হয়েছে।
আপনাকেও সেই কবরেই ফিরিয়ে দেয়া হলো আনন্দময় যাত্রা শেষে এবার কবরের জীবনের বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে লাগলেন ভাবতে লাগলেন আপনি কতটা সৌভাগ্যবান আপনার রব কতটা দয়াশীল যার রহমত ছাড়া এমন আনন্দের অভিজ্ঞতা কখনোই সম্ভব হতো না। আপনার পরী পড়ে গেল আপনার হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদিসটি এবং আপনার মনে পড়ে গেল আজ আপনি ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ না করলে আপনার পরিণতি কেমন হতো।
অবিশ্বাসীদের মৃত্যুবরণ কেমন হবে?
অবিশ্বাসী হয়ে মৃত্যুবরণ করলে আপনার কাছে মালাকুল মাউথ এবং তার সাথিরা আসতো ভয়ঙ্কর রূপে। তাদের দেখা মাত্র আপনি তাদের থেকে দূরে পালিয়ে যেতে চাইতেন। কিন্তু পালানোর কোন সুযোগ তখন থাকতো না। মালাকুল মাউত এগিয়ে আসতে আপনার কাছে এবং ঘৃণা ভরা কন্ঠে বলতো বের হয়ে আয় এ অশুভ আত্মা এই অশুভ শরীর থেকে বের হয়ে আয়। তোর জন্য শাস্তি অপেক্ষা করছে।
এমন ভয়ানক কন্ঠ হতো যে সে শাস্তির কথা না বললেও আপনার আত্মা বের হতে চাইত না। আপনার মৃত প্রায় শরীরকে আঁকড়ে ধরে রাখত। এবং তখন মালাকুল মাউথ এমনভাবে আপনার আত্মাটাকে টেনে হিঁচড়ে শরীর থেকে বের করত যেমনটা ঘন কাটাযুক্ত ডালের ভেতর দিয়ে তুলো বের করে আনা মনে হয়। এবং আপনার আত্মা বের হয়ে আসার সাথে সাথে বাকি ফেরেশতারাও আপনাকে ধিক্কার জানাতে থাকতো।
আপনাকে নিয়ে আসমান পাড়ি দেয়ার সময় যখন প্রথম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতেন সেই আসমান আপনার জন্য খুলে দেয়া হতো না এবং আপনি প্রথমবার আল্লাহর কণ্ঠ শুনতে পেতেন কিন্তু সেই হতো রাগান্বিত এক কন্ঠ। এবং তিনি বলতেন ওর বই সিজ্জিনে নামিয়ে রাখো। এবং এরপর আপনাকে সেই প্রথম আসমানের দ্বারপ্রান্ত থেকে ছুঁড়ে ফেলা হতো আপনার কবরের দিকে।
যে ভয়ঙ্কর পরিণতি আপনার হয়নি কৃতজ্ঞতায় আপনার অন্তরটা ভরে যায় আপনি কবরের ভেতর থেকে শুনতে পান আপনার কাছের মানুষেরা মাটি দেয়া শেষ করে ধীরে ধীরে চলে যায় আপনি প্রথমবারের মতো একা হয়ে পড়েন। অন্ধকার কবরে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ এবং তখনই আপনাকে উঠিয়ে বসানো হয় এবং আপনার সাথে সাক্ষাত করতে আসে দেখতে ভয়ঙ্কর দুজন ফেরেশতা। তাদের দেখে ভয় লাগলেও আপনি জানতেন মুন কার আর নাকির আসবেই। আপনি জানতেন এখন প্রশ্নোত্তরের পালা। এবং ঠিকমতো জবাব দিতে পারলে আপনার আর কোন ভয় নেই।

1 মন্তব্যসমূহ
চমৎকার
উত্তরমুছুন