মানুষ নিউলিথিক বা নব্য প্রস্তর যুগ পেরিয়ে ব্রোঞ্জ যুগের পদার্পণের সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েকটি সভ্যতা বিকশিত হওয়া শুরু করেছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া সিন্ধু গঙ্গা নদীর অববাহিকায় মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পান সভ্যতা ইয়াংসি নদীর তীরে চৈনিক সভ্যতা মধ্যপ্রাচ্যের টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে সুমেরিয় সভ্যতা এবং আফ্রিকার নীলনদের দুই কুলে গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে সভ্যতাগুলো সীমান্ত এলাকাতেও এ সময় কিছু প্রান্তিক জনপদের গোড়া পত্তন করা হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় এমন কয়েকটি জনপদ মানব ইতিহাসে মহা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন একটি সুপ্রাচীন জনপদের নাম জেরুজালেম। একই সাথে ঐতিহ্যবাহী এবং ঐতিহাসিক এই প্রাচীন জনপদ সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত জানাতে এই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে। চলুন তবে আর দেরি না করে মধ্যপ্রাচ্যের এই সুপ্রাচীন জনপদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসি।
![]() |
জেরুজালেম |
জেরুজালেম পরিচিতি
আনুমানিক সাড়ে ছয় হাজার বছর আগে যাত্রা শুরু করা জেরুজালেম নামক জনপদটি যেমন বর্ণিল তেমনি সমৃদ্ধ। প্রত্নতাত্তিকদের গবেষণা অনুযায়ী ভূমধ্যসাগর এবং ডেডস এর মধ্যবর্তী জুডারিয়ান পর্বতমালার একটি উপত্যকায় যাযাবর পশুপালকরা ব্রোঞ্জ যুগের শুরুতে প্রথম একটি অস্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিল। কারন চারদিকে রুক্ষ পা ধরে এলাকার মাঝে ওই টিলার উপর অবস্থিত একটি ঝর্ণা আদিম সেই রাখাল ও তাদের পশুদের পানির চাহিদা মেটাতো।
বর্তমান জেরুজালেম শহরের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে একটি টিলার উপর স্থাপিত সেই বসতিতে মানুষের স্থায়ী বসবাস শুরু হয় এর কয়েকশো বছর পর। বর্তমানে সেই ঝর্ণাটি গৃহন নামে পরিচিত আর শহরের ওই অংশটুকু নাম দেয়া হয়েছে সিটি অফ ডেভিড। ব্রন্জ যুগের যাযাবর সেই রাখালদের স্থাপিত জনপদের অবস্থান ছিল সুমেরীয় এবং মিশরীয় সভ্যতার সীমান্ত এলাকায়। এই দুটি সভ্যতার ইতিহাসে জেরুজালেম জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায় এখন থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে।
জেরুজালেমের ইতিহাস
মিশরীয় এবং সুমেরীয়দের কাছে ওই সময় এই অঞ্চলটি কেনান নামে পরিচিত ছিল। যার ধারাবাহিকতায় ওই সময় এখানে বসবাসকারীদের কেনা নাইট নাম দেয়া হয়েছে। যাযাবর এই রাখালরা একাধিক দেবতার উপাসনা করত। এই দেবতাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল সালেম। কেনানাইট রূপকথা অনুযায়ী তিনি ছিলেন শান্তি এবং গোধূলি লগ্নের দেবতা। ব্রঞ্জ কে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী তারা এই জনপদের শালীন দেবতার নামে উৎসর্গ করেছিলেন। যার ফলে জনপদটির নাম তারাই জেরুজালেম বা শালেমের শহর। জেরুজালেম নামের একটি অর্থ শান্তি শহর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই শহরটি সব সময় দুটো পরাশক্তির সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত ছিল।
ব্রঞ্জযুগে জনপদ কেন্দ্র করে মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছে মিশরীয় এবং হিটরাইট সাম্রাজ্যের মধ্যে। এরপর লৌহজুগে পার্শিয়ান এবং রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যেও রক্তক্ষয়ী বিবাদ ও অব্যাহত ছিল। এরপর মধ্যযুগে অটোম্যান এবং বায়জেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যেও কয়েক দফা হাত বদল হয়েছে এই শহরের মালিকানা। এবং প্রায় প্রতিবারই তার আগে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানি ও রক্তপাতের মত বীভৎসক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে পৃথিবী। ইমুতে একাদশ থেকে চতুর্থ শতকের মধ্যে সংঘটিত ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ গুলোর ধ্বংসলীলার কথা ভাবলে এখনো আঁতকে উঠতে হয়।
১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই সব মিলে শহরটি মোট ৫৩ বার আক্রান্ত হয়েছে। ৪৪ বার এই শহরটির মালিকানা হাত বদল হয়েছে 23 বার শহরের অধিকাংশ স্থাপনা শত্রু পক্ষের গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে। আর গত 2000 বছরে অন্তত দুইবার জনপদটিকে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দেবার মত ঘটনাও ঘটেছে। পৃথিবীতে জেরুজালেমের চেয়ে পুরনো জনপদের অস্তিত্ব থাকলেও এমন অব্যাহত রক্তপাতের বিভীষিকাময় খেতাব আশা করা যায় আর কোন জনপদের কপালেই জুটবে না।
আয়তন এবং জনসংখ্যা
গত শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকা জেরুজালেম শহরের বর্তমান আয়তন ১২৫ বর্গ কিলোমিটার বা ৪৮ বর্গমাইল এর কিছু বেশি। ২০১৮ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেরুজালেমের জনসংখ্যা ছিল ৯ লাখ বিশ হাজারের কিছু কম। অর্থাৎ শহরটি প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় সাড়ে সাত হাজারের মতো অধিবাসী বসবাস করছেন।
আবহাওয়া
বর্তমান শহরের ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর এবং 35 কিলোমিটার পূর্বে ডেড সি বা মৃত সাগরের অবস্থান। এই এলাকাটি তাই ভূমধ্যসাগরে জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত। যে কারণে এখানে গ্রীষ্মের বদলে শীতকালে বৃষ্টি হয়। বছরে রক্তকর থেকে মে মাস পর্যন্ত শহরটিতে ঘরে 437 মিলিমিটার বা ২১ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। জানুয়ারি মাসে জেরুজালেমের কর তাপমাত্রা থাকে 9.1 ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা বছরের সবচেয়ে কম। এখন পর্যন্ত শহরটিতে ধারণকৃত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় 1907 সালের 25 শে জানুয়ারী।
ঐদিন ভোর রাতে জেরুজালেমের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর বিপরীতে জুলাই এবং আগস্ট মাস দুটি বছরের উষ্ণতম মাস। এ সময় জেরুজালেমের গড় তাপমাত্রা থাকে 24.2 ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল 44 দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৮৮১ সালের ২৮শে আগস্ট এই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। জেরুজালেমের ইতিহাস তো পড়লেন এবার চলুন সুপ্রাচীন এই শহরটি সম্পর্কে চমকপ্রদ কিছু তথ্য জেনে নেই।
বস্তুগত নিদর্শন
সাড়ে ছয় হাজার বছরের পুরনো একটি জনপদ ঘিরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের তীব্র আকর্ষণ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তাদের গবেষণার চাহিদা মেটাতে পুরো জেরুজালেম শহরে প্রায় ২ হাজার খনন প্রকল্প সক্রিয় রয়েছে। আর এসব প্রকল্প থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বস্তু প্রদর্শনের জন্য ছোট্ট এ শহরে যাদুঘরের সংখ্যা 60 টি। সাতটি আর্কিওলজিস্টদের পাশাপাশি ডাইনোসরের মতো অতীতের বিলুপ্ত হওয়া প্যালীয়লজিস্টদেরও চাহিদা মেটানোর খোরাক রয়েছে জেরুজালেম শহরে।
শহরটির উপকণ্ঠে অবস্থিত বেইচআই নামক এলাকায় ১৯৬২ সালে এক প্রজাতির ডাইনোসরের পদচিহ্ন আবিষ্কার করা হয়। অর্নিথুমিনীর পরিবার ভুক্ত এই ডাইনোসর গুলো গিরগিটি হলেও এদের চলাফেরা ছিল অনেক চাপ বর্তমান যুগের উটপাখি বা ক্যাসওয়ারির মতো । বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ পরিচয়ই এ ডাইনোসরগুলো প্রায়ই আবার ভেলোসি ডক্টর এর মত অপেক্ষাকৃত বড় ডাইনোসরের শিকারে পরিণত হতো। পদচিহ্নগুলো জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত অবস্থায় আছে।
জেরুজালেমের সিটি অফ ডেভিড নামক অংশের পুরপ্রান্ত ঘেঁষে রয়েছে মাউন্ট অব অলীড বা জলপাই পাহাড় নামক একটি জিলা।এই টিলার একদিকে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো সামাধিস্থল যা এখনো নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। ধারণা করা হয় প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনোই সমাধিস্থলে কমপক্ষে দেড় লাখ সমাধি রয়েছে। আর এই সমাধিস্থলে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি জলপাই গাছের বয়স প্রায় এক হাজার বছরের কাছাকাছি। হানাদার বাহিনীর আগ্রাসন এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের অপতৎপরতা থেকে অধিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিন্তে পুরো জেরুজালেম শহরের পুরোটাই উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা।
সব মিলিয়ে দেয়ালটির দৈর্ঘ্য সাড়ে চার কিলোমিটার। পাথরের তৈরি এ দেয়ালটি ৪০ ফুট এবং আট ফুট চওড়া। দেয়ালের পরিধি জুড়ে মোট ৩৮টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার অবস্থিত। আর শহরে প্রবেশের জন্য আছে সাতটি সুপরিষর দরজা। অতীতে এই দরজার সংখ্যা ছিল আটটি। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দরজাটির নাম গোল্ডেন গেইট। এটি 648 সালে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ১৬ শতক থেকেই দরজাটি সিলগালা অবস্থায় রয়েছে। এই জেরুজালেম শহরের কেন্দ্র অবস্থিত টেমপল মাউস নামক এলাকাটি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের চোখে পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য হওয়ায় এলাকা।
অষ্টম শতকে উমাইয়া রাজ বংশের শাসকরা এখানেই ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমান স্থাপনের একটি চূড়ায় চোখ ধাঁধানো সোনালী রঙের একটি গম্বুজ বসানো আছে। ইহুদি এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এই এখানে গণ প্রার্থনায় অংশ নেন। কমপক্ষে গত দুই হাজার বছর ধরেই জেরুজালেম নামক জনপদের অর্থনীতি পুরোপুরি পর্যটন খাতের উপর নির্ভরশীল।
তীর্থস্থান হিসেবে জেরুজালেম
বিশেষ করে ইহুদি খ্রিস্টান এবং ইসলাম এই তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছে এই শহরটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। যার ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তীর্থযাত্রী পূন্য অর্জনের অভিপ্রায় এখানে উপস্থিত হন। ইসরাইলের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিবছর দেশটিতে আসা পর্যটকদের শতকরা 75 ভাগই জেরুজালেম ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই ইসরাইলে আসেন। ১৯৬০-এর দশকে পুরো জেরুজালেম শহরটি ইসরাইলে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তার আগ পর্যন্ত শহরের পূর্বাঞ্চল জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
১৯৬৭ সালে জর্ডান লেবানন মিশর ইরাক এবং সিরিয়ার মত আরব দেশগুলো ইজরাইলের সীমান্ত এলাকায় আক্রমণ চালায়। তার পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে জর্ডান লেবানন এবং মিশরের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ইসরাইল সেনাবাহিনী। গত শতকে নব্বইয়ের দশকে অবশেষে অধিকৃত এলাকার সিংহভাগ ফিরিয়ে দেয় ইসরাইল। কিন্তু ততদিনেই ইসরাইলি এবং প্যালেস্টাইনের জাতীয়তাবাদী শিবিরের পরস্পরবিরোধী সব দাবি দেওয়ার যাতা কলে নতুন করে আবারও দুটো সাম্রাজ্যের শক্তি প্রদর্শনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় সুপ্রাচিন এই জেরুজালেম শহরটি।
এর একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইজরাইল পন্থী শিবির।আর অন্য দিকে সৌদি আরবের মতো ধনাট্য আরব দেশগুলোর প্যালেস্টাইন পন্থী জোট। এই দুই জোট ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক বেশি উষ্ণ হলেও জেরুজালেম সহ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দুই জোটের জাতা কলে পড়ে এই শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকার অধিবাসীরা মারাত্মক ভোগান্তির মধ্যে আছেন। এর মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েল এ অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসটি রাজধানী তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেম শহরে নিয়ে গেছেন।
তার এই কাজে উৎসাহিত হয়ে একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের আরো কিছু প্রভাবশালী দেশের সরকার। এর ধারাবাহিকতায় জেরুজালেম শহরটি আবারও অশান্তি শহরে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

1 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ হয়েছে
উত্তরমুছুন