সফট ড্রিংক বা কোমল পানীয় কতটা ক্ষতিকর এবং ক্ষতিকর উপাদান গুলো কি?

ফট ড্রিংক বা কোমল পানীয় পান করা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারন বিষয় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এই অভ্যাসটি আমাদের শরীরে যে কত কত ক্ষতিকর জিনিস বয়ে নিয়ে আসতে পারে তা হয়তো আমরা কল্পনাও করিনি। ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখলে আপনি হয়তো আর কোন ধরনের সাসপেন্ড পান করতে চাইবেন না । আমাদের আজকের পর্বে সফট ড্রিংক এর ক্ষতিকর উপাদান গুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

সফট ড্রিংক বা কোমল পানীয়  কতটা ক্ষতিকর এবং ক্ষতিকর উপাদান গুলো কি
কোমল পানীয়

কোমল পানীয়তে অধিক ক্যালোরি থাকে

আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান না কেন সবখানেই কোকাকোলা পাবেন বিশ্বাস শুধুমাত্র দুটি দেশে কোকাকোলা পাওয়া যায় না তাদের একটি দেশ হলো উত্তর কোরিয়া এবং আরেকটি হলো কিউবা। কোকাকোলার ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় তারা প্রতিদিন 1.9 বিলিয়ন বার কোকাকোলা পরিবেশন করে। তারমানে প্রতিদিন ১৯০ কোটি বার কোকাকোলা বিক্রি হয়। না হঠাৎ প্রতিদিন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার চারভাগের এক ভাগ মানুষ কোকাকোলা পান করে। এটা শুধু একটা কোম্পানির হিসাব এর বাইরে বিভিন্ন দেশের অসংখ্য কোমল পানীয় ব্র্যান্ড আছে। এসব সফট ড্রিংক এর একটি প্রধান সমস্যা হল এসব পানিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালরি থাকে। সাধারণত ১০০ মিলিতে প্রায় ৫৫ ক্যালোরি পাওয়া যায়। এক বোতল কোকাকোলায় এত পরিমাণ ক্যালরি থাকে যে আপনি এক বেলা ভাত খেয়েও যোগাড় করতে পারবেন না। এখন প্রশ্ন হতে পারে ক্যালরি তো ভালো জিনিস তাহলে সফটওয়্যারকে ক্ষতিকতায় কিন্তু বিষয়টি হলো একবেলা ভাত খেয়ে আপনার ক্ষুধা মেটে। কিন্তু এই পানীয় খেয়ে আপনার ক্ষুধা মেটে না। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সফ্ট ড্রিংক এর অতিরিক্ত ক্যালোরি আপনার শরীরে কোন ভাল কাজে আসে না। সেই সাথে একবেলা খাবারে স্নেহ আমি শর্করা ভিটামিন সহ নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। কিন্তু কোমল পানিতে তা থাকে না এগুলোতে থাকে অধিক মাত্রায় চিনি। সাধারণত ৬০০ মিলির একটি বোতলে প্রায় অর্ধেক গ্লাস চিনি থাকে এত পরিমাণ চিনি যদি একবারে খেতে বলা হয় তাহলে হয়তো কোন পাগলও খাবে না। কিন্তু আমরা হরহামেশাই কোমল পানীয়র নামে এত এত চিনি খাচ্ছি। এই পরিমাণ চিনি একজন সুস্থ মানুষকে অনেক ধরনের অসুখ-বিসুখ এনে দিতে পারে।

অতিরিক্ত এডেড সুগার থাকে

সাধারণত প্রাকৃতিক খাবার থেকে আমরা যে ধরনের চিনি পাই সেগুলোকে বলে ন্যাচারাল সুগার। কিন্তু কোন খাবারে বাইরে থেকে চিনি প্রবেশ করানো হলে তাকে বলে এডেড সুগার প্রশ্ন হতে পারে একজন মানুষের শরীরে কত পরিমাণ অ্যাডিড সুগার দরকার। উত্তর হলো শুন্য আপনি কোন চিনি গ্রহণ না করলেও আপনার শরীরের সমস্যা হবে না। স্বাধীনতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খাবারগুলো থেকেই ন্যাচারাল সুগার পাওয়া যায়। যেমন দুধে থাকা লেকটোস এবং ফর্মুলা থাকা ফ্রুটস আমাদের ন্যাচারাল সুগারের চাহিদা পূরণ করে। আমাদের দেখে যেহেতু বাড়তি চীনের কোন দরকার নেই তাহলে একজন মানুষের শরীরে সর্বোচ্চ কি পরিমান এডেড সুগার সহ্য করতে পারে‌। প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সর্বোচ্চ 36 গ্রাম এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারী প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২৫ জন সুগার গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু ছোট্ট এক বোতল কোকাকোলা বা পেপসি খেলেই আমাদের শরীরে একবারে প্রায় 80 গ্রাম এডেড সুগার প্রবেশ করে। তারমানে হাফ লিটারের এক বোতল সাবলিঙ্কে আপনার দৈনন্দিন নিরাপদ মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি চিনি থাকে। এত পরিমাণ চিনি অনেক ধরনের রোগের কারণ হতে পারে। দু এক দিন খেলেই সাথে সাথে কোন রোগ তৈরি হবে না কিন্তু নিয়মিত কোমল পানীয় সেবনের ফলে লিভার ড্যামেজ কিডনি ফেইলার হার্ট অ্যাটাক ডায়াবেটিস সহ আরো বেশ কিছু রোগের ঝুঁকি বহু গুনে বেড়ে যায়। এডিট সুগারের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো স্থূলতা অনেকে মনে করে সামান্য একটু মোটা হলে সমস্যা কি কিন্তু এই স্থূলতা থেকেই হৃদরোগ ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যধিও সহজেই শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

চিনি কোকেনের মতো আসক্তিকর

অতিরিক্ত চিনিটা যেহেতু এত সমস্যা তাহলে সফ্ট ড্রিংক কোম্পানিগুলো এই উপাদান ব্যবহার করে কেন? এখানেই আসলে তাদের ব্যবসা এজন্য কোকাকোলার ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা বলতে হয় ১৮৮৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্য ের উপর থেকে কোকাকোলা যাত্রা শুরু হয়। তখন কোকেন এবং কোলা বাদামের নির্যাস দিয়ে কোকাকোলা তৈরি করা হতো। এগুলো ও ওষুধ হিসেবে ফার্মেসিতেও পাওয়া যেত। কিন্তু এটা যেহেতু কঠিন ছিল তাই মানুষ সহজেই কোকাকোলায় আসক্ত হয়ে পড়ে। ১৯০৩ সালে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোকাকোলা তাদের ফর্মুলায় কোকেন মেশানো বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এতদিন কোকাকোলা চলত কারন মানুষ এই জিনিসে আসক্ত ছিল। এখন যদি এমন জিনিস না থাকে তাহলে মানুষ কেন বারবার কোকাকোলা কিনে খাবে। তখন এই কোম্পানি পোকেনের মতোই সমান আসক্তিকর আরেকটি উপাদান খুঁজে পায়। আর তা হল চিনি। শুনতে অবাক লাগলেও মানুষ ভয়ংকর মাদকে যেভাবে আসক্ত হতে পারে চিনি তাও ঠিক একই রকম আসত্তি করার উপাদান আছে। এজন্যই খেয়াল করবেন যারা বেশি মিষ্টি পছন্দ করে তারা নিয়মিতই মিষ্টি খেতে চায়। একই রকম ভাবে যারা কোমল পানীয় পছন্দ করেন তারাও সাধারণত নিয়মিতই খায়। কোমল পানি হতে অধিক চিনি ব্যবহারের পেছনে আরও একটি কারণ আছে। আর তা হল এই ধরনের ড্রিঙ্ক এ এসিড সহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান আর প্রিজারভেটিভ মেশানোর পর যে ৭ তৈরি হয় টাকা দিয়ে কেউ এমন বাজে স্বাদের জিনিস কিনে খেতে চাইবে না। তাই অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি মিশিয়ে সেই বাজে স্বাদ গুলোকে আড়াল করা হয়। চিনির অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে সমালোচনার পর 1964 সালে ডায়েট পেপসি এবং 1982 সালে ডায়েট কোক বাজারে আসে। দাবি করা হয় এই দুই ড্রিংকেই ক্যালোরির মাত্রা শূন্য। তার মানে কি এসব পানীয় নিরাপদ মোটেও না। ডায়েট সফ্ট রিংগুলোতে এসপার্টাম স্যাকারিন এবং শুক্রলোজ এর মত কৃত্রিম মিষ্টি করণ উপাদান মেশানো হয়। এসব রাসায়নিক উপাদান নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অনেক গবেষণায় এগুলোকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সেজন্য বিশাল বহু দেশেই এই উপাদানগুলো নিষিদ্ধ।

অন্যান্য ক্ষতিকার উপাদান

চিনিরপাড় এই সফটওয়্যার আপডেট ক্ষতিকর উপাদান হলো ক্যারামেল। পেপসি কোকাকোলা বাদ দেশি বিদেশি যত কলা পাওয়া যায় সবগুলোই কালো রঙের উৎস হলো এই ক্যারামেল। ক্যারামেল আসলে কি সত্যি কথা বলতে ক্যারামেল হল পোড়া চিনি। অ্যামোনিয়া এবং সালফাইটের সাথে চিনি কে পুড়িয়ে এই ক্যারামেল তৈরি করা হয়। 

এই ধরনের উপাদান কে বলা হয় কারসিনোজেন। ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন উপাদানগুলোকে কারসিনোজেন বলা হয়। শুধু চিনি নয় নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে অধিক পড়া কোন খাবারই নিরাপদ নয়। কোন খাবার বা পানীয়তে ২৯ মাইক্রগ্রামের কম কারসিনোজ থাকলে তা নিরাপদ কিন্তু ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়। কোমল পানিতে ১৩৮ মাইক্রগ্রাম কারসিনোজেন থাকে। 

যার নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন ফান্টা বা মেরিন্ডার মত কমল পানীয়গুলো তো কালো নয়। তাহলে এগুলো নিশ্চয়ই ভালো হবার কথা। কিন্তু এসব পানিতে সিন্থেটিক ফুড কালারের মত আরও ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয়। এই উপাদানগুলো শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট করে। এবং শিশুদের অনেক বেশি চঞ্চল করে তোলে। বিশ্বের বহু দেশেই খাদ্যে এই উপাদান ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সব ড্রিংক এর আরেকটি ক্ষতিকর উপাদান হল সোডিয়াম বেনজয়েট। 

এটি পিঞ্জারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কয়লা বা পেট্রোল পোড়ালে এ ধরনের গ্যাস নিঃসরণ হয়। এই উপাদানো এক ধরনের কার্সিনোজেন। সেই সাথে এগুলো উচ্চ রক্তচাপ ও তৈরি করতে পারে। এছাড়াও কোকাকোলা বা পেপসির মতো কোমল পানি ও বিভিন্ন ধরনের এসিড থাকে। এগুলো সাধারণত হালকা এসিড। এমন একটি উপাদান হলো ফাসফরিক এসিড। এটিও এক ধরনের প্রিজারভেটিভ। যে সমস্ত খাবারের অধিক পরিমাণে চিনি থাকে সেই সব খাবার এই এসিড মেশানো হয়। কারণ ফসফরিক এসিড চিনিতে ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে দেয় না। আরেকটি উপাদান হল সোডিয়াম সাইট্রেট। 

কোমল পানি আর এসিডিটি কমানোর জন্য এই উপাদান মেশানো হয়। ২০০৪ ২০০৬ এবং ২০১৬ সালে বেশ কয়েকবার কোকাকোলা এবং পেপসিতে কীটনাশকের উপস্থিতি ও পাওয়া গেছে। এসব ক্ষতিকার উপাদানের বাইরেও কোমল পানীয়তে আরো বেশকিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে। তবে সেসব উপাদান তেমন ক্ষতিকর নয়। তেমনি একটি উপাদান হল কার্বন ডাই অক্সাইড। এই কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণেই সফ্রিম থেকে বুদবুদ ওঠে।

আলোচিত এই সকল উপাদান বাদে যে কোন সফ্রিঙ্ক এর সবচেয়ে বেশি যে উপাদানটা থাকে তাহলে পানি। স্বাধীনতা সাব্বির মিশ্রণের ৮৫%ই পানি। কিন্তু এই ক্ষতিকর পানীয় তৈরি করতে গিয়ে আমাদের পৃথিবীর বহুমূল্যবান মিঠা পানির ও ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। মাত্র এক লিটার কোমল পানি উৎপাদন করতে প্রায় ৩ লিটারের মতো পানি দরকার হয়। কোমল পানি আর মিশ্রণে থাকায় ক্ষতিকর উপাদানের বাইরে আরো একভাবে এগুলো আমাদের ক্ষতি করতে পারে আর তা হল কোমল পানীয় যেসব প্লাস্টিকের বোতলে বাজারজাত করা হয় সেগুলো থেকে মাইক্রো প্লাস্টিক দূষণ হয়। প্লাস্টিক আবর্জনারই সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ হলো মাইক্রো প্লাস্টিক।

নীরব ঘাতক মাইক্রো প্লাস্টিক কিভাবে মানব সভ্যতাকে নজিরবিহীন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে আমাদের সাথেই থাকুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ