সম্মানিত দ্বীনি ভাই এবং বোনেরা আজকে আমরা মাযহাব নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের এই আলোচনাটিতে আমরা প্রায় দশটি পয়েন্টে কথা বলবেন ইনশাআল্লাহ।
![]() |
| মাযহাব মানেই কি বিভক্তি? |
- মাযহাব কি?
- মাজহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি?
- তারপর মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা ।
- মাযহাবের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ।
- এরপরে চারটি বিখ্যাত মাযহাব কি করে প্রতিষ্ঠিত হলো ।
- সবশেষে এই মাযহাবের চার ইমামের মাঝে সম্পর্ক কেমন ছিল।
- চার ইমামের উদারতা।
- মাযহাব নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত বাড়াবাড়ি।
বি:দ্র: আলোচনাটি মিজানুর রহমান আজহারির থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ।
মাযহাব কি
আমরা জানি যে মাজহাব এটা হচ্ছে আরবি শব্দ এই মাযহাব শব্দের অর্থ হচ্ছে পথ বা মত। কিংবা অভিমত। অর্থাৎ ইমামদের গবেষণালব্ধ যে মতামত বা অভিমত এটাকে আরবীতে মাযহাব বলা হয় ইংরেজি যেটাকে বলে স্কুল অফ ফন্ট। সংক্ষেপে বলা যায় যে যে পথের গন্তব্য কোরআন এবং সুন্নাহ সেটাই হচ্ছে মাযহাব। অনেক সময় এমন হয় যে কোরআন এবং সুন্নতে যে বিধি-বিধান গুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো সরাসরি হয়তো আমাদের বুঝে আসে না কিংবা মানাটাও আমাদের জন্য কষ্ট হয়ে যায়।
সে ক্ষেত্রে এটাকে বুঝবার জন্য এটাকে সহজ ভাবে আমল করবার জন্য আমাদেরকে মাজহাবের যে মতামত সেটার যদি আমরা আমল করি সেটা আমাদের জন্য আমল করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। তাহলে আমরা বলতে পারি যে মাযহাব কোরআন সুন্নাহ বিরোধী কিছু নয় বরং কোরআন এবং সুন্নায় যে বিধানগুলো রয়েছে এগুলোকে একটা ইনওয়ার্ডারে একটা সুবিন্যস্ত ধারাতে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে এই মাজহাবে।
কোরআন ও হাদিসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ব্যাখ্যাই হচ্ছে মাযহাবের ইমামদের সংকলিত ফিকাহ ইসলাম। এবং এই ফিকাহ শাস্ত্রের যে স্কুল অফ ফন্ট এগুলোকে বেসিকলি মাযহাব বলা হচ্ছে। প্রসিদ্ধ মাযহাব আমরা জানি যে চারটি। হানাফি সাফি মালিকি এবং হাম্বলী। আমরা জানি যে কোরআনে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক কিছু উল্লেখ করা হয়েছে এবং মাযহাবে সেটাকে সুশৃংখল ভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নামাজে ফরজ কয়টি? নামাজের ওয়াজিব কয়টি? এ ব্যাপারে কিন্তু আপনি পুরো কুরআন বা হাদিস ঘেঁটে বের করতে পারবেন না যে এতটি মোট সালাতের ফরজ এতটি হচ্ছে সালাতের ওয়াজিব। কোথাও উল্লেখ করা নেই সাধারণত মাযহাবের ইমামগণ নিরলস প্রচেষ্টা করে অনেক গবেষণা করে এ প্রশ্নের উত্তর গুলো খোঁজার চেষ্টা করেছেন এবং তারা হাজার হাজার মাসালা করেছেন। যেটা আমাদের ইসলামিক বিধি বিধানকে বুঝা এবং সহজ ভাবে মানা সহজ করে দিয়েছে। তাহলে আমরা এক কথায় বলতে পারি কোরআন সুন্নাহর সহজ এবং সার নির্জাসি হচ্ছে মাযহাব।
মাযহাব একাধিক হওয়ার কারণ কি?
শুরুতেই আমরা বলেছি মাযহাব মানেই মতামত বা অভিমত। প্রত্যেকের মতামত এক রকম হবে এটা আসলে লজিক্যাল না। যৌক্তিক নয় একেকজনের চিন্তা একেক রকম মতের ভিন্নতা বা বুঝে ভিন্নতা চিন্তার ভিন্নতা এটা মানুষের মাঝে থাকবে এটাই মানুষের সহজাত। এ কারণেই একাধিক মতামত কোরআন সুন্নাহর বিষয়ে আমরা পাচ্ছি।
পাশাপাশি রাসূল সাল্লাল্লাহু ইসলামের পক্ষ থেকেও কোন একটা বিষয় একাধিক আমল প্রমাণিত হয়েছে। ফলে একাধিক মতামত এখানে গড়ে উঠেছে। ধরুন সালাতে কখনো কখনো রাসুল সাঃ বুকের উপরে হাত বেধেছেন কখনো নিচে হাত বেধেছেন কখনো নাভির সাথে মিলিয়ে হাত বেধেছেন কখনো নাভি সংলগ্ন নিচে হাত বেধেছেন।
তো কোন সাহাবার কাছ থেকে বুকের উপরে যে হাত বাধা হয়েছে সেটি গ্রহণ করেছে কোন কোন সাহাবারা নাভি সংলগ্ন নিচে যে হাদিসটি ওনার কাছ থেকে দেখেছেন সেটি গ্রহণ করেছেন। আর কখনো কখনো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্লান্ত হয়ে গেলে হাত বাধা থেকে হাত ছেড়ে দিতেন । অনেক সাহাবারা বিশেষ করে মালিকি মাজহাবের অনেক অনুসারীরা এই মতামত থেকে গ্রহণ করেছেন। এভাবেই কিন্তু একটি প্রসঙ্গে একি বিষয়ে রাসূল সাঃ এর কাছ থেকে যখন একাধিক আমল প্রমাণিত হয়েছে ফলে এক্ষেত্রে একাধিক মতামত ভিন্ন মত এখানে তৈরি হয়েছে।
বিভক্তি কি এই যুগের ফ্যাসাদ
বিষয়টি যে শুধু মাজহাবের কারণে মাজহাবের ইমামরাই করেছেন এমনটি নয় বরং রাসূল সাঃ এর যুগেও সাহাবাদের মাঝে ফিকে অনেক বিষয়ে মতভেদ কিন্তু আমরা দেখতে পাই একটি বিষয়ে একাধিক মতামত দেখতে পাই। সালাতের শুরুতে কোন কোন সাহাবারা সূরা ফাতিহা শুরু করার আগে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আওয়াজ করে পড়ে সালাত শুরু করতেন। আবার অনেক সাহাবারা তো শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এটা কে আওয়াজ করে পড়তেন না।
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন এখান থেকে আওয়াজ দিয়ে শুরু করতেন তাহলে দেখুন সাহাবীদের সময়ও কিন্তু একাধিক মতামত ভিন্ন মত পাওয়া গিয়েছে। সাহাবীদের সময়কালে যে কোন বিষয়ে একাধিক মতামত পাওয়া যেত এক্ষেত্রে আমরা সহি বুখারীর একটি বিখ্যাত হাদিস উল্লেখ করতে পারি, যেখানে আহজাবীর যুদ্ধের প্রসঙ্গটা এসেছে এবং আহযাবের যুদ্ধে যখন মুসলমানরা জয়লাভ করল আল্লাহ রাসূল সাঃ আহযাবের ওই প্রান্ত থেকে বা খন্দকের প্রান্ত থেকে মদিনায় ফিরে আসার প্ল্যান করছিলেন।
জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন-
ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনারা তলোয়ার নামিয়ে ফেলেছেন আমরা তো নামাইনি। আল্লাহতালা আদেশ দিয়েছেন যে বনু কুরাইজাতে অভিযান পরিচালনা করতে হবে আপনি মদিনাতে যাবেন না বরং বনুকোরাইজার দিকে যান। একথা শুনে মুহাম্মদ সাঃ সাহাবীদের বললেন ডিরেক্টলি এখান থেকে বনু করাইজায় চলে যাবে। তোমরা কেউ কিন্তু পথের মধ্যে আছর পরবে না বরং বনুকোরাইজাম গিয়ে আসরের সালাত পড়বে।
কমান্ডের সাথে সাথে সবাই মদিনা থেকে বেশ দূরে ইহুদীদের একটা দুর্গ ছিল সেখানে ইহুদি কমিউনিটি সেখানে থাকতো। রাসূল সাঃ বললেন আসরের নামাজ তোমার বনু কুরায়জায় গিয়ে আদায় করবে। সাহাবীরা চলতে শুরু করলেন পথিমধ্যে আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। তাদের ভেতর একদল ভাবলো যে আসরের ওয়াক্ত যেহেতু হয়ে গেছে আমরা এখানেই পড়ে নিব। উনারা বললেন রাসুল সালাম এই কথাটি দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন তোমরা এত দ্রূত সেখানে যাবে যাতে সেখানে যেয়ে আসরের নামাজ পড়বে।
কিন্তু যেহেতু আমাদের দেরি হয়ে গেছে অতএব যখন আচরের সময় হয়েছে আমরা এখানেই নামাজ পড়ে নিব। উনারা এই চিন্তা থেকে মাঝপথেই আসরের নামাজ পড়ে নিল। আর কিছু কিছু সাহাবী বললেন রাসুল সাঃ আমাদেরকে আদেশ করেছেন বনু কুরায়জায় না গিয়ে কিছুতেই আসরের নামাজ আদায় করা যাবে না। এবং তারা মাঝপথে সালাত আদায় না করে বনু কুরায়জায় পৌঁছে নামাজ আদায় করলেন।
রাসুল সাঃ যখন পৌঁছলেন তখন তার কাছে বিষয়টি পেশ করা হলো। তিনি সেটি শুনে কাউকে কিছু বললেন না। এখন রাসুল সাঃ এর একটি আদেশে একজন যেটা বুঝতে পারলো অন্যজন তার ঠিক উল্টো বুঝতে পারলো। আর রাসুল সাঃ বললেন ঠিক আছে কোন সমস্যা নেই। এই দুইটি মতামতের কোনটা যদি ভুল হতো তাহলে আল্লাহ রাসুল চুপ থাকতেন না। কোন একটি বিষয়ে একাধিক মতবাদ সঠিক হতে পারে বনু কুরায়জার এই ঘটনাটি তার প্রমাণ করে। অর্থাৎ সব বিষয়ে একটি মত সত্য এটা নাও হতে পারে। কখনো কখনো একাধিক মতবাদ সত্য হতে পারে। অতএব এই যে মতের ভিন্নতা এটা শুধু আমাদের মধ্যেই না এবং শুধু ইমামদের মধ্যেই না সাহাবীদের মধ্যেও ছিলেন।

0 মন্তব্যসমূহ