স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় তাকিয়ে থাকায় শিশুদের ক্ষতি হচ্ছে নাতো?স্ক্রিনটাইম কি?কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

মোবাইল ও কম্পিউটার মনিটরে অতিরিক্ত সময় তাকিয়ে থাকায় শিশুদের যে পাঁচটি ক্ষতি হচ্ছে.
স্ক্রীন টাইম

স্ক্রিনটাইম বলতে আসলে কি বোঝায় সহজ কথায় যদি বলি তাহলে স্ক্রিন টাইম হচ্ছে কোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে আপনি যতটা সময় ব্যয় করছেন ঠিক ততটা। সেটা হতে পারে টেলিভিশন দেখা সিনেমা বা ভিডিও দেখা গেমস খেলা কম্পিউটার ব্যবহার করা ট্যাবলেট বা ফোন ব্যবহার করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম করাও হতে পারে। কিন্তু কিভাবে বুঝবেন যে আপনি বা আপনার পরিবারের কোনো সদস্য অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন কিনা। এর জন্য কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজতে পারেন যেমন পরিবারের সদস্যরা মিলে কোন একটি কাজ করতে গেলে সেখানে কি স্ক্রিন টাইম কোন ধরনের সমস্যা তৈরি করছে? এর কারণে কি আপনার ঘুমে কোন সমস্যা হচ্ছে? টিভি দেখা বা ফোন ব্যবহার করার সময় কি আপনি খাবার খাচ্ছেন ?যদি এই সব প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার পরিবারে স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে নেই।

আর এই স্কিন টাইম নিয়ন্ত্রনে না থাকলে কি সমস্যা হয় আর সেগুলো কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? জানতে হলে সাথে থাকুন।

মোটা হয়ে যাওয়া

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনোসেফের এক গবেষণা বলছে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা স্ক্রিনের পেছনে বেশি সময় ব্যয় করলে বাইরে যাওয়া বার শারীরিক কর্মকান্ডের পরিমাণ কমে যায়। শিশুরা বাইরে খেলা বা দৌড়াদৌড়ি করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যার কারণে শিশু এবং তরুণদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধির শারীরিক স্থূলতা বৃদ্ধি সহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।

শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক বয়স যেমনই হোক না কেন বিশেষজ্ঞরা বলছেন smartphone গেমিং কনসোল বা ডিফাইস কম্পিউটার ল্যাপটপ এবং ট্যাবলেটে বেশি সময় কাটালে তা দৃষ্টি শক্তিতে প্রভাব ফেলে। এরফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে শিশু এবং কম বয়সীরা। তাদের মধ্যে মায়োপিয়া নামে এক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে যার কারণে দূরের জিনিস দেখতে ঝাপসা মনে হয়। বিশেষ করে বলছেন ডিভাইসে মুখ বুঝে থাকা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সূর্যের আলোতে পর্যাপ্ত সময় ধরে না তাকানোর কারণে এমনটা হচ্ছে।

শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে বাধা

মোবাইল ও কম্পিউটার মনিটরে অতিরিক্ত সময় তাকিয়ে থাকায় শিশুদের যে পাঁচটি ক্ষতি হচ্ছে.
স্ক্রীন টাইম


যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে চার হাজার শিশুর উপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যেসব শিশুরা দুঘন্টা বিনোদনমূলক কাজে স্ক্রিনে থাকে নয় থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমায় এবং কমপক্ষে এক ঘন্টায় শারীরিক কর্মকাণ্ড করে তাদের সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা যারা এগুলো মেনে চলেনা সেসব শিশুর তুলনায় অনেক বেশি ভালো থাকে। কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা বলছেন ১৮ মাস বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের স্ক্রিন দেখা উচিত নয়। গবেষকরা বলছেন এই বয়সে শিশুরা বেশি স্ক্রীন টাইমে থাকলে তাদের ভাষা শিখতে বা কথা বলতে দেরি হতে পারে এবং তারা মানুষের সাথে সহজে মিশতে পারে না। এমনকি তাদের মস্তিষ্কের বিকাশের ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া শিশুরা মোবাইল ডিভাইস এবং সামাজিক মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে তাদের মধ্যে মনোযোগহীনতা বিস্মৃতি এবং নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ দেখা দেয়।

বিষন্নতা ও উদ্বেগ।

ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক এক গবেষণায় বলা হয় বেশি পরিমাণে টেলিভিশন দেখার কারণে শিশু এবং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়। এর কারনে তাদের মধ্যে নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া আত্মমর্যাদা কমে যাওয়া এবং তাদের মধ্যে মন খারাপ তৈরি হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। আর যারা কম্পিউটার ব্যবহার টিভি দেখা এবং ভিডিও গেমস খেলার প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদে মানসিক কষ্ট উদ্বেগ এবং বিষণতা দেখা দেয়।

বুদ্ধিভিত্তিক ক্ষমতা কমে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন মানুষ যখন বেশি সময় ধরে স্ক্রিনের সামনে থাকে তখন সে এক ধরনের পরোক্ষ গ্রহিতা বা প্যাসিভ রিসিভার হয়ে যায়। তাহলে তার সামনে যদি এমন কোন কনটেন্ট আসে যা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয় না আর সে যদি সেগুলো গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তার স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা কমে যায়। এক সময় শেয়ার কঠিন কোন কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। সে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে।

কি করবেন?

এতক্ষণ যেসব শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার কথা আমরা জানলাম সেগুলো থেকে মুক্তি পেতে হলে কি করতে হবে এমন প্রশ্নের একটাই উত্তর আর তা হলো স্ক্রীন-টাইন কমাতে হবে। ইউনিভার্সিটি অফ গ্লাস কো পরিচালিত এক গবেষণা বলছে মানুষ যদি স্ক্রীন টাইম প্রতিদিন দুই ঘন্টা কমিয়ে আনে তাহলে সাধারণ মৃত হার ৫.৬২ ভাগ এবং হৃদরোগ থেকে মৃত্যুহার ৭.৯৭ ভাগ কমিয়ে আনা যায়। তাহলে স্ক্রিনশাইন কমিয়ে আনতে হলে কি করা যেতে পারে?


মোবাইল ও কম্পিউটার মনিটরে অতিরিক্ত সময় তাকিয়ে থাকায় শিশুদের যে পাঁচটি ক্ষতি হচ্ছে.
স্ক্রীন টাইম

পরিকল্পনা করুন বা লক্ষ ঠিক করুন।

স্ক্রীন টাইম কমাতে হলে শুরুতেই যে কাজটি করতে হবে সেটি হচ্ছে অবসর সময় আপনি কি করবেন তার জন্য একটি পরিকল্পনা করুন বা লক্ষ্য ঠিক করুন। যেমন গল্পের বই পড়া পরিবারের সদস্যদের কাছে সাহায্য করা নতুন কিছু শেখা কোন শখ থাকলে সে সম্পর্কিত কাজ করা ইত্যাদির নানা বিষয় পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এসব কাজে জড়িয়ে পড়লে দেখা যাবে যে আপনার স্ক্রীন টাইম এমনিতেই কমে যাচ্ছে।

স্কিন টাইম নিয়ন্ত্রন করুন

ছোটদের উৎসাহিত করতে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের স্ক্রিন টাইম কমানো উচিত। আপনার শিশু কখন কতক্ষণ ধরে স্ক্রিনে থাকবে তা ঠিক করুন । আমেরিকার অ্যাসোসিয়েশন অফ পেডিয়াট তাদের নীতিমালায় বলেছে যে আঠারো মাসের কম বয়সী শিশুদের ভিডিও চ্যাট ছাড়া আর কোন ধরনের স্ক্রিন টাইম থাকা উচিত নয়। দুই বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে বাবা মায়েরা কিছু ডিজিটাল মিডিয়ার সাথে পরিচিত করাতে পারেন তবে এ ক্ষেত্রে শিশুরা যা দেখবে সেগুলো অবশ্যই ডিজিটাললি উঁচু মানসম্পন্ন হতে হবে। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীরা দিনে ১ ঘন্টা উচ্চমান সম্পন্ন ভিডিও দেখতে পারে তবে এক্ষেত্রে বাবা মাকে সাথে থাকতে হবে। আর ৬ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে স্ক্রিন টাইমের কারণে যাতে শিশুর ঘুম এবং শারীরিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্থ না হয়।

পরিবারের সাথে সময় কাটান

নিজে স্ক্রিনের বাইরে থাকতে চান কিংবা পরিবারের অনুষদস্যদের মধ্যে যদি এই অভ্যাস থেকে থাকে এবং তা যদি আপনি দূর করতে চান তাহলে পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানোর বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন কাজ যেমন রান্না করা বাদাম করা শারীরিক ব্যায়াম করা এগুলো পরিবারের সবাই মিলে করতে পারেন। এছাড়া অবসরে সবাই মিলে ঘুরতেও যেতে পারেন। আর আপনার শিশুকে সময় দিলে তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশও মজবুত হবে। বাসায় নির্দিষ্ট একটি স্থান নির্বাচন করুন যেখানে সব ধরনের ডিভাইস কিংবা মিডিয়া ব্যবহার করার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এটি হতে পারে আপনার শোয়ার ঘর এতে করে ঘুমেরও সমস্যা থাকলে সেটাও দূর হয়ে যাবে।

মোবাইল ও কম্পিউটার মনিটরে অতিরিক্ত সময় তাকিয়ে থাকায় শিশুদের যে পাঁচটি ক্ষতি হচ্ছে.
স্ক্রীন টাইম

ঘুমের দিকে লক্ষ্য রাখুন

ঘুমানোর এক ঘন্টা আগে থেকেই স্ক্রিন টাইম বন্ধ করতে হবে। যাতে করে মস্তিষ্ক ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। ভালো ঘুমের জন্য প্রশান্ত পরিবেশ এবং সহনীয় মাত্রার আলো খুবই দরকারি। এছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের জন্য বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুম খুব দরকারি।

হাঁটুন

স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষকরা বলছেন স্ক্রিনশ্যাম কমিয়ে ওই সময়টাতে যদি স্বাস্থ্যসম্মত কোন অভ্যাস যেমন হাটা বা জগিং করা যায় তাহলে তা মানসিক এবং শারীরিক দু দিক থেকেই উপকারী হয়। তাই সুস্থ থাকতে হলে হাঁটুন ব্যায়াম করুন স্ক্রীনের বাইরে সময় কাটান। ( সূত্র:বিবিসি বাংলা) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ