যেভাবে পতন হলো উসমানীয় খেলাফতের..এরদোয়ান পর্ব :২ ।

উসমানী যুবকেরা সুসংগঠিত হয়ে উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। তাদের এই রাজনৈতিক দলের নাম দেয়া হয় ইন্তেহাদ ও তিরিআকি জামায়াত। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের তোরে জনগণের সমালোচনায় ও চাপে উসমানী খেলাফতের সুলতান আব্দুল হামিদ খান তাদের চলতি সংবিধান পরিবর্তন করে সংস্কার করার ঘোষণা দেন।

উসমানী খেলাফতের পরাজয়

১৯০৮ সালে প্রণয়ন করা এই সংবিধানকে তাত্ত্বিকরা লিজাটি মেসি দুই বলে সম্বোধন করেন । সে সংবিধান অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থার বৃদ্ধ অংশ জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ব্যস্ত করার লক্ষ্যে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নিজেদের মধ্যে দলাদলি ও স্বার্থের বিবাদের কারণে 1908 সাল থেকে 1918 সাল পর্যন্ত মোট 22 টি সরকার ব্যবস্থা গঠিত হলেও তা বারবার ভেঙে দিতে বাধ্য হন উসমানী খেলাফতে সুলতান। সে অনুযায়ী এক একটি সরকার ব্যবস্থা করে পাঁচ মাস করেও শাসন কার্য ধরে রাখতে পারেনি। এরমধ্যে ১৯১১ থেকে ১৯১২ সালে ইতালি ও উসমানী খেলাফতের মধ্যে যুদ্ধে উসমানী খেলাফত পরাজয় বরণ করে।

ইতালি পুরো উত্তর আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় উসমানী খেলাফত তার সীমানা থেকে আফ্রিকার দেশগুলোকে হারায়। পাশাপাশি উসমানী খেলাফত সামরিক দিক থেকেও দুর্বল হয়ে পড়ে সাকুল্যে ১৯১১ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে ওসমানী খেলাফত তাদের আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলোতে রাজত্ব হারায়। এই যুদ্ধের রেস্ট সামলে উঠতে না উঠতেই কয়েক মাসের মাথায় আবারও বাল কান দেশগুলোর সাথে যুদ্ধে নামতে হয় বালকান্দ দেশগুলো উসমানীদের পরাজিত করে। যার ফলে বাল কান তথা পূর্ব ইউরোপের এই দেশগুলো উসমানী খেলাফতের সীমানা থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরই মাঝে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উসমানী খেলাফত একেবারে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটাই কাল হয়েছিল।যুদ্ধে  উসমানী খেলাফত মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে এবং কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে অবস্থান নেয়।

কিন্তু যুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তি অর্থাৎ উসমানী ও জার্মানির পরাজয়ের পর উসমানী খেলাফতের অধিকাংশ এলাকা মিত্র শক্তিগুলো দখল করে নেয়। তারা সেখানে উপনিবেশিকতা প্রশাসন পরিচালনা করে এমনকি উসমানী খেলাফতের মূল ভূখণ্ড আনাতোলিয়া অর্থাৎ আজকের তুরস্ক দখলের জন্য শত্রুপক্ষ চারদিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। বিভিন্ন সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শত্রুপক্ষের সাথে অনেকগুলো লক্ষ্য স্থলে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যার মধ্যে কেবল গালিপলি যুদ্ধ অর্থাৎ জানাকালী যুদ্ধ ছাড়া বাকি প্রায় সবকটি স্থানে উসমানীরা পরাস্ত হয়। 

গালিপলির যুদ্ধে বিজয়ের পর শত্রুপক্ষের সাথে চুক্তির মাধ্যমে কেবল আজকের তুরস্কের ভূখণ্ড টুকু ধরে রাখতে পারলেও মিত্রশক্তির দেশগুলো তুরস্কের স্থল জলপথ গুলো নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। এবং সভাপতি উসমানীরা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই যখন অবস্থা তখন তুরস্কের সর্বশেষ সীমানাটুকু হাতের মুঠোয় নিতে আজকে তুরস্কের চারদিক থেকে যুক্তরাজ্য ফ্রান্স ইতালি গ্রিস ও আর্মেনীয়রা সরাসরি এবং রাশিয়া ও আমেরিকা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে। দুর্বল সেই উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এতগুলো শক্তিশালী দেশের এই যুদ্ধই তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। 

যেভাবে পতন হলো উসমানীয় খেলাফতের

রেজেব তাইয়্যেব এরদোয়ান

আধুনিক তুরস্কের স্থপন

যুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন ওসমানী সেনা কর্মকর্তারা ও পরবর্তী সময়ে আধুনিক তুরস্কের স্থপতি মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক। কয়েক বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে তুরস্কের ঐতিহাসিক জয়ের পর পরিশেষে ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত লুজান চুক্তির মাধ্যমে সমাপ্ত হয় এবং আজকের সীমানায় আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৯ সে অক্টোবর ১৯২৩ সালে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা দেয়া হয় গাজী মোস্তফা কামাল তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং ইসমেথ ইনুনো প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। এর মাঝে ১৯২২ সালের এক নভেম্বর উসমানী খেলাফত কে বিলুপ্ত করা হয় 1923 সালে তুরস্ককে যখন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখন তুরস্কের অবস্থা একেবারে নাজুক ছিল। 

প্রথমে বালকান যুদ্ধ পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানী খেলাফত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার নিহত ও আহতদের ভার তাদেরকে বহন করতে হয়েছিল। এর মাঝে আবার স্বাধীনতা যুদ্ধে গোটা ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছে। যার ফলে ১৯২৩ সালে এসে গোটা দেশে একটি মৃত্যুপুরী এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সম্ভবত এমন বাড়ি পাওয়া খুবই দুষ্টু ছিল যেখানে দু-একজন শহীদ পাওয়া যায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত সেই উসমানী খেলাফতের সাথে অনেকটা বিদ্রোহ করেই মোস্তফা কামাল কাজ শুরু করেন। তার কথায় ছিল ঐক্যের সুর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে তার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা ব্যক্ত করেন জনগণের সামনে। তাই তারা ডাকা কংগ্রেসগুলোতে জনগণের ব্যাপক সাড়া পান তিনি। তারা মোস্তফা কামাল কে তুরস্কের নতুন এক সাহসী বীর খলিফা হিসেবে চিন্তা করতে থাকে। 

যে কিনা তাদেরকে এই দুঃসহ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ দেখাবে। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ সংসদ শুরুর মাধ্যমে মোস্তফা কামালের নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সেই শুরুটা হয়েছিল কিভাবে তা বর্ণনা করা হলে তখনকার সমাজের মানুষের মানসিক বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করা যাবে।

গাজী মোস্তফা কামালের টেলিগ্রাফ

এক বক্তব্যে এরদোয়ান ঠিক এভাবেই বর্ণনা করেন আমি আপনাদেরকে ১৯২১ সালের ২১ এপ্রিল সংসদ চালু করার ব্যাপারে গাজী মোস্তফা কামালের টেলিগ্রাফটি সংক্ষিপ্ত আকারে পড়ে শোনাবো এটি অনেক অর্থবহুল টেলিগ্রাফ। এ টেলিগ্রাফটি আপনাদেরকে এবং আমার প্রিয় জাতিকে মনোযোগ সহকারে শোনার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

গাজী মোস্তফা কামাল 1921 সালের একুশে এপ্রিল এভাবে বলেছিলেন যার সারমর্ম আকারে বলছি। আন কারা খুবই জরুরী বার্তা ১৯২১ সালে ২১ এপ্রিল, আল্লাহ সহযোগিতা নিয়ে এপ্রিলের ২৩ তারিখ শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর আলকারায় গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি খোলা হবে দেশের স্বাধীনতা মর্যাদা খেলাফতকে সমুন্নত করা সুলতানের রাজত্ব ধরে রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পার্লামেন্ট জুম্মার দিনে এই দিনের মর্যাদা কে ধারণ করেই চালু হবে। সকল এমপিদের নিয়ে আমি করার বিখ্যাত মসজিদ হাজী ভাই রাম বেলি জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করে কোরআনের নূর এবং নামাজের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করা হবে। নামাজের পর রাসূল সাঃ এর পবিত্র দাড়ি মোবারক এবং নিদর্শন গুলো যেগুলো এখন ইসলাম বলে জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে সেগুলো সংসদের অধিবেশন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে। অধিবেশন কক্ষে ঢোকার পূর্বে একটি দোয়া পড়ে সেখানে পশু কুরবানী করা হবে ।

আজকে থেকে ২৩ এপ্রিল দিনটিকে মর্যাদা পূর্ণ করার জন্য প্রদেশের কেন্দ্রগুলোতে সম্মানিত ওয়ালী সাহেবদের অর্থাৎ গভর্নরদের আয়োজনে খতম পড়াবেন এবং বুখারী শরীফ পড়া শুরু করবেন। খতমের শেষ অংশ জুম্মার নামাজের পর সংসদের অধিবেশনের স্থানে পড়ে শেষ করবেন। সংসদ অধিবেশন শুরুর জন্য জুমার নামাজের পূর্বে সকল জায়গায় মিলাদ পড়া হবে। এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে দোয়া করা হবে। কমিটির পক্ষে মোস্তফা কামাল। এই সময়ে একটি জাতিকে স্বাধীনভাবে তার কার্যক্রম পরিচালনা স্বার্থে সকল রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকে মোস্তফা কামাল। আজ আপাতত এইটুকুই থাক পারবে এ সংক্রান্ত আরো জরুরী অধ্যায় নিয়ে ফিরে আসবো আশা রাখছি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ