আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্টাতা
![]() |
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক |
মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে আসুন আমরা একটু পেছন ফিরে তাকাই। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ছিলেন ওসমানীয় সামরিক কর্মকর্তা বিপ্লবী রাজনৈতিক লেখক এবং তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি তিনি আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। তাকে আধুনিক তুরস্কের জনক বলা হয়। আধুনিক বলতে তিনি মুসলিম ঐতিহ্যকে ভুলে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কাজ করেছেন। সাবেক ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে একটি আধুনিক পশ্চিমা ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতি রাষ্ট্রে রূপান্তর এবং সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল তার। আতাতুর্কের সংস্কার আন্দোলনের মূলনীতির ওপর আধুনিক তুরষ্ক স্কুল প্রতিষ্ঠিত। বহির্বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মুসলমানদের শিকড়কে ভুলতে বসেছিল তুরস্করা। যার ফলে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের তৈরি করা সব নিয়মকানুন দ্বারা পাল্টে ফেলে। নিজেদের চালচলন বেশভূষা সবকিছু দিয়ে পশ্চিমা দের কেউ ছাড়িয়ে গিয়েছিল তুরষ্করা।
বর্তমান তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান
এরপর ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবটা এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আসার পর তুরস্কের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিচয় আবারো ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৮৪ সালের পর রেজেব তাইয়্যেব এরদোগান প্রথমবার তুরস্কের ইতিহাসে একদলীয় দল হিসেবে এবং পরপর চারবার সংশোধন নির্বাচনে বিজয়ী হয়। রাষ্ট্রপতি হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাসীন এই দলের সভাপতি ও প্রধান দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেও ২০০৩ সাল হতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং তার পূর্বে 1994 সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়েও হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামের প্রতি আঘাত ভালোবাসা তিনি প্রায়ই তার নানা কর্মকান্ড দ্বারা প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো আইসোফিয়া মসজিদ উন্মুক্ত করা। মিডিয়ার কল্যাণে তুরস্ক আজ সমগ্র বিশ্বে জনপ্রিয় ।
তুরষ্কের ড্রামা সিরিজ গুলোতে এরদোয়ান কেন অর্থায়ন করছে ?
![]() |
রেজেব তাইয়্যেব এরদোয়ান |
যে বিষয়টি মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে বেশ নাড়া দিয়েছে তা হলো তুরস্কের ড্রামা সিরিজে অশ্লীল দৃশ্য। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এই ড্রামা সিরিজের পরিবর্তনে এসেছে। আমরা অনেকেই আমাদের মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে জানি না চারপাশে যখন প্রেম কাহিনী আর অশ্লীল চিত্র ভরপুর সেখানে মুসলিমদের তৃষ্ণা মেটাতে এরদোয়ান ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর সরকারি অর্থায়নে সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টি আর টি ওয়ানে দিরিলিস আরতুগুল নামের ড্রামা সিরিজ সম্প্রচার করা শুরু করে। এরপর সমগ্র বিশ্বের তৃষ্ণার্ত মুসলমানরা পেল নতুন প্রাণ তুরস্কের সিরিজ গুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সব সিরিজের শীর্ষ সিরিজ হল দিরিলিস আরতুগুল। বর্তমানে আফগানিস্তান, আলবেনিয়া ,আলজেরিয়া আরব দেশে বিশেষ চারটি চ্যানেল আজারবাইজান, বাংলাদেশ ,বসনিয়া ও ব্রাজিল, চিলি ,ইন্দোনেশিয়া, জরদান ,কাজাকিস্তান ,পাকিস্তান ,সোমালিয়া ,দক্ষিণ আফ্রিকা, উজবেকিস্তান ,উত্তর সাইপ্রাস ,তিউনিসিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য, কানাডা ভেনিজুয়েলা আন্তর্জাতিকভাবে মোট ২২ টি দেশের ২৬ টি চ্যানেলে এই দিরিলিস আরতুগুল সম্প্রচারিত হতো। কিন্তু ২০১৬ সালে বাংলাদেশের দুইটি চ্যানেল একুশে ও মাছরাঙ্গা টেলিভিশন এবং ২০২০ সালে আরব দেশের চারটি চ্যানেলে এই সিরিজ সম্প্রচার করা বন্ধ করা হয়। মধ্যপ্রাচের অনেকে মনে করে এই ড্রামা সিরিয়ালের মধ্য দিয়ে তুরস্ক কূটনীতিতে তাদের সফট পাওয়ার প্রয়োগ করতে চাইছে। দিরিলিস আরতুগুল ঠিক কি ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা দিচ্ছে তা নিয়ে বিতর্কের জেরে সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশরে এই সিরিজ গুলো এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্ভবত খুব শীঘ্রই বাহরাইনেও নিষিদ্ধ করা হবে।
অশ্লীলতা ইতিহাস বিকৃতি কিংবা আরবের সংস্কৃতি পরিপন্থী হওয়ার জন্য যে এই ড্রামা সিরিজ নিষেধ করা হয়েছে এমনটা নয়। সে দেশে বলিউড ও হলিউডের রঙিন চলচ্চিত্র গুলো ভালো জনপ্রিয়। সেটা নিষিদ্ধ করার কোন উদ্যোগ কোন কালে নেয়া হয়নি। তাহলে দিরিলিস আরতুগুল কেন নিষিদ্ধ করা হলো। আসলে বিষয়টা রাজনৈতিক । অভিযোগ রয়েছে এই সিরিজ প্রচারের মধ্য দিয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান তুরস্কের অতীত ইতিহাস বিশ্ববাসীকে জানান দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে আরব বিশ্ব কোন ভাবে এটা মেনে নেবে না ।কারণ আরব বিশ্বের ওহাবী সালাফী বাদের সাথে সুফিবাদি ও স্থানীয়দের বিরোধিতা ইতিহাস অনেক পুরনো। তবে আরতুগুল সিরিজ নিয়ে তুরস্কের ভেতর কিন্তু বিতর্ক থেমে নেই। সে দেশে দিরিলিস আরতুগুলের সমালোচকরা মনে করেন যে এই সিরিজের মাধ্যমে সুকৌশলে সে মুসলিম জাতীয়তাবাদের বার্তা দেয়া হচ্ছে তা রাষ্টপতি এরদেয়ানকে তার ক্ষমতা সংহত করতে সাহায্য করছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে মুসলিম বিশ্বে ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিচিত করতে চাচ্ছেন। আর এসব কাজে তিনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন দিরিলিস আরতুগুল ও ক্রুলুস ওসমানের মত ড্রামা সিরিজ গুলোকে।
এমনকি এই সিরিজের লেখক ও প্রযোজক মেহমেদ বস্তাবক প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। এরদোয়ান নিজেও বহুবার প্রকাশ্যে সিরিজের প্রশংসা করেছে শুধু কি তাই তিনি একবার তার স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে শুটিং এর স্পটে চলে যান।
অভিনেতা ও টেকনিশিয়ানের সাথে কুশল বিনিময় করেন শুধু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নন ভেনি জুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকুলাস মাদুরাও দিরিলেসের সেটে আসেন এমন কি তুর্কি যোদ্ধাদের টুপিও পড়তে দেখা যায় তাকে। সব মিলিয়ে ড্রামা সিরিজের মধ্য দিয়ে তুরস্ক বিশ্বে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। এ কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। একই সাথে ক্ষমতা সুসংহত করতে ও মুসলিম বিশ্বের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানো এ ধরনের ড্রামা সিরিজ গুলোকে ব্যবহার করছেন। এমনটাই মনে করছেন অনেকেই। কি আছে এই আরতুগ্রূলের কাহিনীর মাঝে ?যা নিয়ে এত সমালোচনা? আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই।
দিরিলিস আরতুগুল
![]() |
দিরিলিস আরতুগুল |
১২৫৫ সালের মধ্য এশিয়ার এক তৃণভূমিতে তাবুর শহর গেড়েছে কারিগর ও যোদ্ধাদের এক গোত্র । দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া মঙ্গলদের থাবা ও অন্তরঘাতি ক্রুসেডদের হুমকির মুখে তারা খুজছে বসতি করার জমি। প্রচন্ড মর্যাদাশীল এই গোত্রের প্রধান সুলেমান শাহ আরতুগুলের পিতা সিরিয়ার আলিপুর আরব আমিরের সাহায্য চাইছে কোন দিকে কোন আশা নেই তাদের সহায় শুধু মধ্যযুগের প্রখ্যাত সুফি ইবনে আরাবির আধ্যাত্মিক শক্তি। এক সময় তারা ঘুরে দাঁড়ালেন ঘোড়া ছুটালেন কনস্টান্ট্রি পোলের উদ্দেশ্য। তখন তাদের নেতা হবেন আরতুগুলের সন্তান ওসমান বিন সুলতান তার নেতৃত্বে তুর্কিমেনিস্তানের যাযাবর টুকরা ইউরোপের নাকের ঢগায় মুসলমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। অনেকের বিশ্বাস এর মধ্যে দিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর আমলের ভবিষ্যৎবাণী সত্য হয়েছে একদিন বাইজেন্টেনিয়া মুসলমানদের অধিকারী আসবে। আর তার শাসন করবেন ন্যায়বান মুসলমান আমির। তুর্কি ভাষায় দিরিলিস আরতুগুল মানে হল পুনরুজ্জীবন । কিন্তু এই ইতিহাস কেন এরদোয়ানের দরকার হল । তার দরকার অটোম্যান সাম্রাজ্য পুনরুজ্জীবনের স্বপ্নে জাগিয়ে তুলে ক্ষমতা সংহত করা ।



0 মন্তব্যসমূহ