ট্রেড লাইসেন্স কেন প্রয়োজন এবং কিভাবে করবেন?

ট্রেড লাইসেন্স একটি ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস। বাংলাদেশে বৈধভাবে কোন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হলে আপনাকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার এই লাইসেন্সের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে বৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার অনুমতি প্রদান করে। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া যে কোন ব্যবসায়ী অবৈধ। 

ট্রেড লাইসেন্স ব্যবসার পরিচয় ও অভিজ্ঞতা বহন করে। এই লাইসেন্স ব্যবসায়ীর প্রতি বিশ্বাস এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা তৈরি করে। ট্রেড লাইসেন্স কেন প্রয়োজন কোথায় করা যায় ট্রেড লাইসেন্স করতে কি কি লাগে এবং খরচ কত সেসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে আজকের আর্টিকেলে।

ট্রেড লাইসেন্স কেন প্রয়োজন এবং কিভাবে করবেন?
ট্রেড লাইসেন্স 

ট্রেড লাইসেন্স এর সুচনা

১৯৮৬ সালের মিউনিসিপাল কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন বিধিমালা অনুসারে স্থানীয় সরকার কোন ব্যবসা বা পেশার ক্ষেত্রে কর আদায় করতে পারবে। এই আইনের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯ বলা হয়েছে সিটি কর্পোরেশন যেকোনো ধরনের ব্যবসায় কর আদায় করতে পারে। এই দুটি আইনের সূত্রই হল ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তি। 

এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ এলাকায় বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করা হয়। ট্যাক্স বা কর আদায় করার জন্যই স্থানীয় সরকার ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। ট্রেড লাইসেন্স প্রদান এবং লাইসেন্স নবায়ন করে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার তার বিভিন্ন ধরনের খরচ মেটায়।

ট্রেড লাইসেন্স পেতে বেশ কিছু নিয়ম ও শর্ত মানতে হয়। এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পর এই লাইসেন্স পাওয়া যায়।

ট্রেড লাইসেন্স কেন প্রয়োজন?

বাংলাদেশের যে কোন স্থানে ব্যবসা করতে হলে আপনাকে ট্রেড লাইসেন্স করতে হবে। ট্রেড লাইসেন্স না থাকলে যে কেউ নিজেকে ব্যবসায়ী দাবি করতে পারে না। বরং তার ব্যবসায়ী কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হয়। ট্রেড লাইসেন্স না করলে কোন এলাকার ব্যবসা করলে জেল জরিমানাও হতে পারে। তাই কোন ব্যবসার প্রথম শর্ত হচ্ছে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হবে। 

তাছাড়া আপনি আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক একাউন্ট খুলতে চাইলে বা অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র তৈরি করতে চাইলে ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া আপনি আইনগতভাবে একজন ব্যবসায়ী হতে পারবেন না। এবং কোথাও কোন ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধাও পাবেন না। সকল ধরনের ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। 

কয় প্রকারের ব্যবসা হল শতাধিকারী বা প্রোপাইটারশিপ ব্যবসা পার্টনারশিপ ব্যবসা যেকোনো ধরনের কোম্পানি অফিস ফ্যাক্টরি কোন ব্যবসার ব্রাঞ্চ অফিস ক্লিনিক অথবা ব্যক্তিগত হাসপাতাল ছাপাখানা আবাসিক হোটেল ঔষধ এর ব্যবসা আমদানি রপ্তানি ব্যবসা ইত্যাদি সকল ব্যবসার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে।

ট্রেড লাইসেন্স কোথায় করা যায়?

ট্রেড লাইসেন্স মূলত স্থানীয় সরকার প্রদান করে। যেমন সিটি কর্পোরেশন পৌরসভা ইউনিয়ন পরিষদ জেলা কিংবা জেলা পরিষদ। যে স্থানীয় সরকারের অধীনে আপনি আপনার ব্যবসা পরিচালনা করবেন সেখান থেকে আপনাকে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে আপনি সারা দেশে ব্যবসা করতে পারবেন। তবে আপনি যদি অন্য কোথাও অতিরিক্ত কোন অফিস বা ব্রাঞ্চ খুলে থাকেন তবে সেখানকার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। 

ঢাকা শহরের জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এই সেবা প্রদান করে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ ও ভার্সিটি কর্পোরেশনের অধীনে দশটি করে অঞ্চল যা পাঁচটি জোনাল অফিসের আওতাভুক্ত রয়েছে। আপনার প্রতিষ্ঠানটি যে অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত সেই অঞ্চলের অফিস থেকে লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে।

ট্রেড লাইসেন্স করতে কি লাগে?

সাধারণত এক ব্যবসার সাথে অন্য ব্যবসার মিল থাকে না। তাই ট্রেড লাইসেন্স তৈরির জন্য এক এক ধরনের ব্যবসায় একেক ধরনের কাগজপত্র লাগে। সাধারণত প্রোপাইটারশিপ বা স্বত্বাধিকারী ব্যাবসায় যা লাগে বাকি অন্যান্য ব্যবসায়ীও তা প্রয়োজন হয়। সাথে বিশেষ বিশেষ ব্যবসার জন্য বিশেষ বিশেষ অনুমোদন লাগে। স্বত্বাধিকারী ব্যবসা বা সাধারণ ব্যবসার ক্ষেত্রে।

  • নিজের দোকান হলে ইউটিলিটি বিল কপি ।
  • দোকান ভাড়ার চুক্তি পাত্রের সত্যায়িত ফটোকপি ।
  • হালনাগাদ হোল্ডিং ট্যাক্স পরিষদের ফটোকপি লাগে।
  • আবেদনকারীর ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি 
  • ভোটার আইডি কার্ড দরকার হয়।

 অন্যান্য ক্ষেত্রেও এসব কাগজপত্র লাগে। সেই সাথে আরো কিছু কাগজ যোগ হয় যেমন পার্টনারশিপ বা অংশীদারি ব্যবসার ক্ষেত্রে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিপত্র করতে হয়। তবে ২০০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র না করলে এর কোন মূল্য থাকে না। তাই ঢাকার অনেক জোনে ২০০০ টাকার চুক্তিপত্র ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করে না। 

লিমিটেড কোম্পানির জন্য মেমোরান্ডাম অফ আর্টিকেল ও ইনকপোরেশন সার্টিফিকেট এর প্রয়োজন হয়। চাকরি বা কারখানার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস এবং পরিবেশ ছাড়পত্রের কপি দরকার হয়। ক্লিনিক অথবা ব্যক্তিগত হাসপাতালের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমোদন লাগে। ঔষধের ব্যবসার ক্ষেত্রে ড্রাগ লাইসেন্সের কপি ছাপাখানা ও আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি রিক্রুটিং এজেন্সির ক্ষেত্রে মানবসম্পদ রপ্তানি ব্যুরো কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্স অস্ত্র ও গোলাবারুদের ক্ষেত্রে অস্ত্রের লাইসেন্স ট্রাভেলিং এজেন্সির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন হয়। তবে সকল ক্ষেত্রে অবশ্যই কোনো বাণিজ্যিক স্থানে ব্যবসা করতে হবে। তা না হলে আপনি আইনত ট্রেড লাইসেন্স পাবেন না।

ট্রেড লাইসেন্স করতে খরচ কত?

একেক ধরনের ট্রেড লাইসেন্স করতে একেক রকমের খরচ হয়। লাইসেন্সের ধরন এবং কোন স্থানে লাইসেন্স করছেন তার উপর খরচ নির্ভর করে। সর্বশেষ 2016 সালের গেজেট অনুসারে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কোন ব্যবসা করতে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য সাধারণত ৩০০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল খরচ হতে পারে। তবে কেউ যদি এক নামে একাধিক ধরনের ব্যবসা করতে চায় সেক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন অনুসারে খরচ বাড়বে। 

তবে কেউ যদি লিমিটেড কোম্পানির ট্রেড লাইসেন্স করতে চাই তাহলে তার খরচ পরিশোধিত মূলধনের উপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে একই ট্রেড লাইসেন্সে একই খরচে একাধিক ক্যাটাগরি যুক্ত করা যায়। এছাড়া মূল খরচের বাইরেও প্রতিষ্ঠানের আয়তন অনুসারে সাইনবোর্ড ফি লাইসেন্স বই ফি এবং এগুলোর উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করতে হয়।

ট্রেড লাইসেন্স করার প্রক্রিয়া কি?

প্রথমেই আপনাকে জানতে হবে আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি কোন স্থানীয় সরকারের আওতায় পড়েছে। আপনার প্রতিষ্ঠানটি যে অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ওই অঞ্চলের অফিস থেকেই আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে। এরপর আপনার ব্যবসার ধরন অনুসারে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সহ ফর্মটি জমা দিতে হবে। তারপরের ধাপে আপনাকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে সি ও ভ্যাট জমা দিতে হবে। 

এর পরের ধাপে স্থানীয় সরকারের একজন অফিসার আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে দেখবেন ব্যবসার ধরন আয়তন ঠিকানা ইত্যাদি ঠিক আছে কিনা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আপনি ট্রেড লাইসেন্স টি তিন থেকে সাত কর্ম দিবসের মধ্যে পেয়ে যাবেন। আপনি যদি কোন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হন এবং নিজে নিজের ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তাহলে দক্ষ কারও সাহায্য নিতে পারেন।

ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন।

মনে রাখতে হবে ট্রেড লাইসেন্স শুধু করলেই হবে না প্রতিবছর এই ট্রেড লাইসেন্সটি রিনিউ বা নবায়ন করতে হবে। আপনি যখনই ট্রেড লাইসেন্স করে থাকেন না কেন প্রতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। রিনিউ করার জন্য একই খরচ ও ভ্যাট দিতে হয়। সেই সাথে নতুন করে তিন হাজার টাকা উৎস কর যোগ হবে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না করলে সেটি নিজে নিজেই বাতিল বা বন্ধ হয়ে যায় না বরং এর জন্য প্রতি মাসে ১০ শতাংশ হারে জরিমানা প্রদান করতে হবে। তবে আপনি ট্রেড লাইসেন্স বন্ধ করতে চাইলে বিনা খরচে যে কোন সময় তা বাতিলও করতে পারবেন। 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ