১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে জমতে থাকে চাপা ক্ষোভ। দু জাতের শিল্পী সংস্কৃতি আলাদা হলেও পাকিস্তান সরকার চাপিয়ে দিতে থাকে উর্দু ভাষা।মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন উর্দই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকা যাবে না যে উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
![]() |
| ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ইতিহাস |
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন রাষ্ট্রভাষা উর্দু নীতি কে সমর্থন করলে বাঙালির চাপা ক্ষোভ আন্দোলনে বিস্ফোরিত হয়।অবিলম্বে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা অ্যাকশন কমিটি একুশে ফেব্রুয়ারি রাজপথে আন্দোলনের ডাক দেয়। আন্দোলন থামাতে পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। পুলিশের বাধা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে ছাত্র শিক্ষক সহ সাধারণ জনগণ।
![]() |
| ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ইতিহাস |
উত্তাল হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর চড়াও হয় পুলিশ। তারপরেও ছাত্র-জনতা এগিয়ে যায়। অ্যাসেম্বলি হলের দিকে। তাদের থামাতে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। ভাষার জন্য প্রাণ দেন সালাম রফিক বরকত জব্বার সহ আরো অনেকে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হয় বাঙালির অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। গড়ে ওঠে ৭১ এর মুক্তি সংগ্রামের ভিত্তি।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন
পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগের মুখোমুখি বাঙ্গালীদের যুক্তফ্রন্ট। মাওলানা ভাসানীর আওয়ামী মুসলিম লীগ আর একে ফজলুল হকের কৃষক- শ্রমিক লীগের সম্মিলিত যুক্তফ্রন্ট আমাদের সাধিকারের লক্ষ্যে তুলে ধরে বাংলার ২১ দফা দাবি। আওয়াজ তুলে বাঙ্গালীদের ন্যায্য অধিকারের।
- বাংলাকে জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি
- পাট শিল্প জাতীয়করণ
- উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন
- শিক্ষা নীতি সংস্কার।
এক ইঞ্চি ও ছাড় দেওয়া যাবে না আর। নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ ভোটে নির্বাচিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এবং একে ফজলুল হককে মন্ত্রিসভার গঠনের জন্য আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। যুক্তফ্রন্টকে অপসারণ করা হয় ক্ষমতা থেকে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে ঝড় তুলে বাঙালি। আর পাকিস্তানের কাছে পদদলিত হওয়া যাবে না। মুক্তির পথে এগোতে হবে আমাদের।
তৈরি হয় গণপরিষদ
স্বাধীনতা আইনের অধীনে তৈরি হয় গণপরিষদ। যার দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের সংবিধান এবং জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা করা।গণধিকারের প্রস্তাবে আবারো কোণঠাসা করা হয় বাঙ্গালীদের। পাকিস্তানকে এক ইউনিট স্কিম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এবং এক ইউনিট স্ক্রিমে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের কোন সুযোগ রাখা হয় না। জরুরী পরিস্থিতির অজুহাতে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয় সেনা মোতায়নের ক্ষমতা। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের মাঝে বাড়তে থাকে অসন্তোষ।
১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর
কু ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি ইসকান্দার মির্জা। জারি হয় সেনা শাসন পূর্ব পাকিস্তানের শুরু হয় নির্বিচারে শোষনের আরেকটি কালো অধ্যায় । ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান।রাজনৈতিক তৎপরতার উৎস ছিল দেশের ছাত্র জনতা। তাদের রুখতে জেনারেল আইয়ুব খান গঠন করে শরিফ কমিশন। শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর নামে শরীফ কমিশন পেশ করে নতুন সব নীতিমালা। নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্র রাজনীতি। যেন আন্দোলনে যুক্ত না হতে পারে ছাত্ররা।
বাড়িয়ে দেওয়া স্কুল কলেজের ফি যেন ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে পড়াশোনা। নতুন নিয়ম নীতির নামে সীমিত করা হয় উচ্চশিক্ষার সুযোগ। বাড়িয়ে দেওয়া হয় স্কুল কলেজের কোর্সের বোঝা। ডিগ্রি কোর্সের মেয়াদ যেন পড়াশোনা শেষ করতে না পারে আমাদের ছাত্ররা। নতুন নীতিমালা কে প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে ফেটে পড়ে ছাত্র সমাজ। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার শরীফ কমিশনের নীতি প্রয়োগ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের জনমানুষ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায় স্বাধীনতার দিকে।
১৯৬৬ সালে উত্থাপন করা হয় ছয় দফা দাবি
শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে উত্থাপন করেন ছয় দফা দাবি। উদ্দেশ্য ছিল বাঙ্গালীদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। ছয় দফা দাবির শর্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকা। সমগ্র পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থা। কর নির্ধারণের স্বাধীনতা। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই পাকিস্তানের আলাদা হিসাব। আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন।
![]() |
| ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ইতিহাস |
ছয় দফা দাবিতে ক্ষিপ্ত পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করে শেখ মুজিবকে। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয় আন্দোলন। বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে ৬ দফা দাবি নিয়ে আসে এক নতুন মোড়। যার ফলশ্রুতি ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। এবং তারপর মুক্তিযুদ্ধ।
৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান
বাঙালির রাজনৈতিক উদ্দিপনায় শঙ্কিত হয় পাকিস্তান। মিথ্যা মামলায় আটক করে পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের। তাদের মুক্তির দাবিতে ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ ফেটে পড়ে তীব্র প্রতিবাদে। ডাকসুর নেতৃত্বে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো এক হয়ে গঠন করে student action committee. নেতাদের মুক্তি আর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের গণ আন্দোলনে শুরু হয় ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভ পরিণত হয় বাংলার মুক্তির আন্দোলনে। মিছিল থামাতে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হয় ছাত্র নেতা আসাদ। আসাদের মৃত্যু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনের তৈরি করে সংগ্রামের আগুন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি বন্দি অবস্থায় নিহত হন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সার্জন জহুরুল হক। তার মৃত্যু সংবাদে লক্ষাদিক লোকের জনসভায় ভাষণ দেন মাওলানা ভাসানী। বলেন দু মাসের মধ্যে ১১ দফার বাস্তবায়ন এবং সকল রাজবন্দীর মুক্তি না হলে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হবে।
১৮ ই ফেব্রুয়ারি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডাক্তার শামসুজ্জোহা নিহত হলে ক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা সব কিছু উপেক্ষা করে নেমে আসে রাস্তায়। রাজবন্দীদের নিঃস্বার্থ মুক্তি দিতে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সরকার। আইয়ুব খান ক্ষমতা তুলে দেয় ইয়া ইয়া খানের হাতে। ঘনিয়ে আসে সত্তরের নির্বাচন। বাঙালি অনুভব করে নিজেদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সব না পাওয়া দাবি পূরণ হবেই।১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয় হয় আওয়ামীলীগ। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে অশ্বিকৃতি জানাই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী।
৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দান
বজ্রকণ্ঠে মুক্তি সংগ্রামের ডাক দেন শেখ মুজিব।এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।এ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে থাকে পাকিস্তানি সেনা। আর আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে ইয়াহিয়া খান।
২৫ শে মার্চ রাত ১২ টা
শুরু হলো গন হত্যা। ধর্ষিত হলো নারীরা ধর্ষিত হল মানবতা। বাঙালি যুদ্ধে নামে ২৬ শে মার্চ। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে মানুষ। যার যা ছিল তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে। লক্ষ্য একটাই স্বাধীন বাংলাদেশ চাই।
১০ এপ্রিল তৈরি হয় অস্থায়ী সরকার। বাংলাদেশের নিরস্ত্র বাঙালি শুরু করে গেরিলা যুদ্ধ। একের পর এক পাকিস্তানি সব ঘাটির পতন হতে থাকে।
![]() |
| ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ইতিহাস |
পিছিয়ে ছিলেন না কণ্ঠযোদ্ধারাও । বিশ্বের কাছে তারা তুলে ধরতে থাকেন যুদ্ধে বাংলাদেশের সব সাফল্য। গানে কবিতায় ছড়িয়ে দেন স্বাধীনতার প্রেরণা।নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষের দিকে পরাজয় নিশ্চিত জেনে গুনে গুনে হত্যা করল এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
![]() |
| ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ইতিহাস |
রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আঁকা হয় নতুন দেশের মানচিত্র দেয়া হয় নতুন নাম বাংলাদেশ।





0 মন্তব্যসমূহ