বাংলাদেশের মেগা প্রকল্প ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প ? জানা-অজানা ।

রাজধানী ঢাকা শহরের জন ভোগান্তির অন্যতম উপাদান পরিবহন খাত। পরিবহন খাতের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নাম ম্যাস রেপিড ট্রানজিট। যা সংক্ষেপে এমআরটি নামে পরিচিত। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প গুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকা মেট্রো রেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ঢাকা ম্যাচ ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা ডিএমটিসিএল নামে একটি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। 


ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প
মেট্রোরেল প্রকল্প


ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প

মেট্রোলের কয়টি ভাগ রয়েছে প্রথম দিকে এটি উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রথম ভাগ শেষ করতে খরচ হবে মোট ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং পূর্বাচল থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত পাতাল রেলসহ নির্মাণ ব্যায় ধরা হয়েছে সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রো রেল নির্মাণের খরচ হবে ৪১ হাজার কোটি টাকা। 

তার মানে এই তিনটি লাইন নির্মাণ করতেই প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে এর বাইরেও মেট্রোরেলের আরও বেশ কয়েকটি লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকার একমাত্র থেকে আরেক প্রান্তে যাতায়াতের ব্যবস্থা সহজ হলে এই শহরে বসবাসের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। ইতোমধ্যে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। রাজধানী বাসীর কাঙ্ক্ষিত প্রকল্প ঢাকা মেট্রোরেল সম্পর্কে আলোচনা করা হবে আজকের আর্টিকেলে।

মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক

২০১২ সালে ঢাকা ম্যাস রেপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা মেট্রোরেল সম্পর্কে প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে ঢাকা এবং ঢাকার আশেপাশের এলাকা থেকে যাতায়াত সহজ করতে মেট্রোরেল কে বেশ কয়েকটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। তবে প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত অংশটি নির্বাচন করা হয়। 

এরপরই বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পাতাল রেল এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত উড়াল পথের সমন্বয়ে আরেকটি রুটের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবার কথা। এরপরই আছে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত উড়ালপথ এবং পাতাল রেলের সমন্বয়ে আরেকটি এমআরটি প্রকল্প। এর দৈর্ঘ্য হবে ২০ কিলোমিটার। যা ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা। এছাড়া গাবতলী থেকে দাসারকান্দি পর্যন্ত উড়াল এবং পাতাল রেলের সমন্বয়ে ১৭.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি রোড ২৩০ সালের মধ্যে নির্মিত হবে। 

একই সময়ের মধ্যে গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতাল ও উড়াল রেল প্রকল্প পরিকল্পনাধীন রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ এর মধ্যেও ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় না বাড়লে ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা বাসীর শহরের যে কোন প্রান্ত থেকে সহজে যাতায়াত করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

উত্তরা থেকে কমলাপুর মেট্রোরেল প্রকল্প

মেট্রোরেলের প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়। এই অংশটির নাম এমন আর টি লাইন সিক্স। জাপানের ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ। ধারণা করা হচ্ছে মেট্রোরেলের প্রথম ধাপ চালু হলে প্রতি ঘন্টায় ষাট হাজার যাত্রী এতে যাতায়াত করতে পারবে। ২০১৬ সালের ২৬ জন এমআরটি লাইন সিক্সের নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। 

এই রুটের প্রাথমিক নকশা অনুযায়ী 16 টি স্টেশন থাকার কথা। স্টেশন গুলো হল উত্তরা উত্তর উত্তরা সেন্ট্রাল দক্ষিণ পল্লবী মিরপুর ১১ মিরপুর ১০ কাজীপাড়া শেওড়াপাড়া আগারগাও বিজয় সরণি ফার্মগেট কারওয়ান বাজার শাহবাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ সচিবালয় এবং মতিঝিল। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে পরিকল্পনাকারীদের মাথায় আসে এই লাইনটির মতিঝিলে শেষ না করে কমলাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত করা সম্ভব। 

ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প
 মেট্রোরেল প্রকল্প


কমলাপুর শহর এমআইটি লাইন সিক্সের স্টেশন সংখ্যা দাঁড়াবে ১৭ টি। বাংলাদেশের অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পে কেন জানি সংশোধনী বাজেট ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরাবরের মতোই এ মাটি প্রকল্পের ও সংশোধনী প্রস্তাব সড়ক পরিবহন বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত এমআরটি লাইনের দৈর্ঘ্য 1.16 কিলোমিটার। অতিরিক্ত এই অংশ নির্মাণের খরচ ধরা হয়েছে ১১৪৮৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মোট বাজেট দাঁড়িয়েছে তেত্রিশ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তারমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেল পথ তৈরি করতে খরচ হচ্ছে ২২ হাজার কোটি টাকা। 

আর মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার তৈরিতে খরচ হবে ১১ হাজার কোটি টাকা। কর্তৃপক্ষ বলছে বাড়তি কাজ বাস্তবায়নসহ অন্যান্য বিভিন্ন খাতের কারণেও প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। তবে ঢাকা মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন সিক্স একসাথে পুরোটা চালু করা যাবে না। এই প্রকল্পের উত্তর আর দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১.৭৩ কিলোমিটার অংশের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এই রুটে মেট্রোলের নিয়মিত পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই মেট্রোরেলের এই অংশের উদ্বোধন করা হবে। এই লাইনের বাকি অংশের কাজ ও পুরোদমে চলছে। 

উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত লাইনের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়ার জন্য পুরো প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে আরো এক বছর বেশি সময় লাগবে। ধারণা করা হচ্ছে সেক্ষেত্রে মেট্রোরেলের প্রথম ধাপের সম্পূর্ণ প্রকল্পটি শেষ করতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।

মেট্রোরেলের দ্বিতীয় ধাপের প্রকল্প পাতাল রেল

ঢাকা মেট্রো রেলের বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত অংশটি লাইন ওয়ান হিসেবে পরিচিত । এটিও দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফাস্ট ট্র্যাক বা অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প। এই লাইন দুটি অংশে বিভক্ত। একটি হল বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রোড এবং আরেকটি নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল রুট।

বিমানবন্দর রুটের দৈর্ঘ্য ১৯.৮-৭ কিলোমিটার এই পথ নির্মিত হবে মাটির নিচ দিয়ে। সেজন্য এখানে বারোটি পাতা স্টেশন থাকবে। ঢাকা স্টেশন গুলো হল কমলাপুর রাজারবাগ মালিবাগ রামপুরা হাতিরঝিল পূর্ব বাড্ডা উত্তর বাড্ডা নতুন বাজার খিলখেত বিমানবন্দর টার্মিনাল তিন এবং বিমানবন্দর। এইরুটেই বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল বা পাতাল রেল চালু হতে যাচ্ছে। 

যদিও ঢাকা পাতাল রেল বা ঢাকা সাবওয়ে নামে আরেকটি ভূগর্ভস্থ রেল নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ঢাকা সাবওয়ে পরিকল্পনা করেছে। মেট্রোরেলের পাতাল রেল আর ঢাকা সাবওয়ে দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা প্রকল্প। তবে ভবিষ্যতে কোন এক সময় এই দুইরুট একক পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালিত হবে। 

এমআরটি লাইনে ১ এর পূর্বাচল রুটের দৈর্ঘ্য ১১.৩৬ কিলোমিটার। এই অংশে থাকবে উড়ালপথ। যেখানে স্টেশন থাকবে নয়টি। এখানকার নতুন বাজার এবং নর্দা স্টেশনটি থাকবে পাতাল পথে। উড়ালপথের বাকি সাতটি স্টেশন হলো জোয়ার সাহারা বোয়ালিয়া মস্তুল শেখ হাসিনা ক্রিকেট স্টেডিয়াম পূর্বাচল সেন্ট্রাল পূর্বাচল পূর্ব এবং পূর্বাচল টার্মিনাল। 

পরবর্তীতে অন্যান্য এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন হলে বেশ কয়েকটি স্টেশনের মধ্যে ইন্টার চেঞ্জ তৈরি হবে। ইন্টারচেঞ্জ স্টেশনগুলোর মাধ্যমে এরুট থেকে অন্যরুটে সহজেই যাতায়াত করা যাবে। তুহিন টানেল বোরিং মেশিন ব্যবহার করা হবে। বিমানবন্দর রুটে মাটির উপর থেকে দশ মিটার গভীরে পাশাপাশি দুটি সুরঙ্গ তৈরি করা হবে। মালিবাগ থেকে রাজারবাগ এলাকায় সড়কের প্রশস্ততা কম হওয়ায় এবং ফ্লাইওভারের পাইল থাকায় দুটি টানেল পাশাপাশি নির্মাণ না করে উপর নিচে তৈরি করা হবে। 

একই টানেল মাটির উপর থেকে দশ মিটার এবং আরেকটি ৩০ মিটার গভীরে নির্মাণ করা হবে। ২৫ সেট মেট্রো ট্রেন দিয়ে এই পথে যাত্রা শুরু হবে। প্রতিশোধ মেট্রোরেলে আরটি কোচ থাকবে দুরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে মেট্রো রেল পরিচালনার জন্য থাকবে বিশেষ অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার। মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ দ্বারা চালিত হবে। সেজন্য মেট্রোরেলের নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সহ একাধিক উৎস থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করা হবে। প্রতিবার টিকেট কাটার ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে এমআরটি পাস এবং গ্রাফিক পাস ব্যবহার করে যাত্রীরা সহজে যাতায়াত করতে পারবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ