২০১৬ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় দুটি স্কুলের প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী রহস্যজনকভাবে অজ্ঞান হওয়ার পর কতৃপক্ষ জেলার ৫৭ টি মাধ্যম স্কুল দুদিন ধরে বন্ধ রেখেছিল। একই বছরের জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায় নয় শ্রমিকের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের ভর্তি এবং কয়েকদিন আগে বাগেরহাটের চিতলমারীতে শিক্ষিকা সহ কয়েক শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবর আসে সংবাদ মাধ্যমে।
 |
| ম্যাস হিস্টিরিয়া কি? |
জানা যায় এই প্রতিটি ঘটনাটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ম্যাস হিস্টোরিয়া। নাইস হিস্টিরিয়া বা সাইকোজেনিক ইলনেস কিংবা গণ মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। শুধু বাংলাদেশী নয় পুরো বিশ্বেই এই রোগটি স্বীকৃত। মধ্যযুগেও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এই সাইকোজেনিক ইলনেস্টা বা ম্যাস হিস্টিরিয়া আসলে কি? কেনই বা হয় আর হলে কি হয়? চলুন জেনে নেই বিস্তারিত।
ম্যাস হিস্টিরিয়া কি?
সাধারণত ম্যাস হিস্টোরিয়া হলে অস্বাভাবিক কোনো আচরণ চিন্তা অনুভূতি কিংবা স্বাস্থ্যগত উপসর্গ কোন একদল মানুষের মধ্যে দেখা দেয়। বিশেষ করে প্যানিক বা আতঙ্ক অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস শরীর কাঁপতে থাকা ইত্যাদি উপসর্গ থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর কোন বাস্তব কারণ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেল সোসিওলজিস্ট রবার্ট বার্থোলোমিউ বলেন হিস্ট্রিয়া হচ্ছে একটি সম্মিলিত চাপের প্রতিক্রিয়া যা স্নায়ুতন্ত্রের অতিরিক্ত উদ্দীপনাকে প্ররোচিত করে। এটাকে তিনি বর্ণনা করেন অনেকটা সফটওয়্যার জনিত সমস্যা হিসেবে।
লন্ডনের কিংস কলেজ অব হসপিটালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সায়মন ওয়েসলি বলেন হিস্টিরিয়া হচ্ছে এক ধরনের সামগ্রিক আচরণ বা কালেক্টিভ বিহেবিয়ার তিনি বলেন এটাকে প্রাই মেডিকেল কন্ডিশন বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে ধরা হয় কিন্তু প্রথাগত বায়োমেডিকেল বা চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আর এটি ছড়িয়ে পরে মানসিক এবং সামাজিক বৈশিষ্ট্যের কারণে।
আবার অনেক বিশেষজ্ঞ ম্যাস হিস্টোরিয়াকে বলেন এক ধরনের কনভার্শন ডিসঅর্ডার বা এক ধরনের মানসিক সমস্যা যা আবেগীয় উত্তেজনাকে শারীরিক উপসর্গে পরিণত করে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মস্তিষ্কের কাজকে বাধা গ্রস্থ করে যার কারণে শারীরিক নানা উপসর্গ দেখা দেয় যার উপর ব্যক্তির কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা।
ম্যাস হিস্টিরিয়ার ইতিহাস
encyclopedia Britannica এর তথ্য অনুযায়ী হিস্টোরিয়াকে বর্তমানে বলা হয় কনভারশন ডিসঅর্ডার এটা এক ধরনের মানসিক ব্যাধি যা স্নায়বিক পেশি সঞ্চালনা এবং মানসিক ব্যাঘাতের কারণ হয়। এটাকে এক ধরনের সাইকোনিরোসিস বলা হয়। হিস্টোরিয়া শব্দটি গ্রিক শব্দ হিস্টিরা থেকে নেয়া হয়েছে। যার অর্থ যোনি বা জরায়ু।
তখন মনে করা হতো যে হিস্টরি আসলে নারীদের রোগ এবং জরায়ুর অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে এর উৎপত্তি হয়ে থাকে। তবে পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে যে হিস্টোরিয়া নারী পুরুষ যে কারো হতে পারে। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক সবাই এতে আক্রান্ত হতে পারে। তবে যৌবনের শুরুতেই এতে আক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মানসিক এবং স্বাস্থ্যগতভাবে নাজুকদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।
ম্যাস হিস্টিরিয়ার ধরন
মেডিকেল জার্নাল জার্নাল অফ দা রয়েল সোসাইটি অফ মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী:
ম্যাচ হিস্টোরিয়া দুই ধরনের
ম্যাস এঞ্জাইটি হিস্টোরিয়া
সাধারণ ঘনিষ্ঠ প্রায় আইসোলেটেড বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর বা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের হিস্টিরিয়া দেখা দেয়। এতে মানুষের মধ্যে হঠাৎ করেই উত্তেজনা অ্যাংজাইটির অন্যান্য উপসর্গ যেমন অস্থিরতা বিপদের ভয় হৃদ স্পন্দন বেড়ে যাওয়া শ্বাসকষ্ট শরীর কাঁপতে থাকা ইত্যাদির নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয় এবং এগুলো অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
অবশ্যই এই হিস্টোরিয়া অল্প সময়ের জন্য হয় এবং ভালো হয়ে যায়।
ম্যাস মটর হিস্ট্রেরিয়া
দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মানুষের মধ্যে এই হিস্টোরিয়া দেখা দেয়।এতে মাথা ঘোরা দেখতে সমস্যা হওয়া কথা বলতে সমস্যা হওয়া গিলতে সমস্যা শরীর কাঁপতে থাকা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। এই উপসর্গ এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে ছড়া এবং অনেক সময় এটা এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ম্যাচ হিস্টোরিয়া কথা বলা এবং দেখার মাধ্যমে ছড়ায় তার মানে হচ্ছে ম্যাচ হিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত কাউকে দেখলে ওই ব্যক্তির মধ্যেও একই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞরা আবার একে বর্ণনা করেছেন অবাস্তব কোন হুমকির কারণে সামগ্রিক আতংক হিসেবে।
ম্যাস হিস্টিরিয়ার কারন
বিশেষজ্ঞরা বলেন ম্যাচ হিস্টোরিয়া সব সময় একটি ইনডেক্স গেস বা কোন একটি ব্যক্তি থেকে শুরু হয়। রবার্ট বার্থোলোমিউ বলেন এটি একজন থেকে শুরু হয় এবং প্রেসার কুকারের মত মানসিক চাপ ময় পরিবেশে সেটি খুব তাড়াতাড়ি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। তার মতে এতে একটি দলীয় পরিস্থিতিতে অ্যাংজাইটি অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার দরকার হয় তেমন কোন একজন সহপাঠীর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দেখে অন্যসহ পাঠিও অজ্ঞান হতে পারে । যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরী অফ মেডিসিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেখানে ম্যাচ হিস্টোরিয়া হয় সেই স্থান বিশেষ করে স্কুল বা কারখানার ঘটনার আগে বেশ কিছুদিন বা সপ্তাহ ধরে ওই স্থান বন্ধ থাকতে দেখা যায়। পরিবেশগত কোন একটি উদ্দীপক যেমন বাজে দুর্গন্ধ শব্দ সন্দেহজনক কোন বস্তু দেখা কিংবা অন্য কোন কিছু যাকে একদল মানুষ মনে করে যে তারা কোন বিপদে পড়েছে এবং তার থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতার উপসর্গে ভুগতে শুরু করে। অনেক সময় যে ব্যক্তির থেকে হিস্টোরিয়া শুরু হয় তার মধ্যে কিছু বাস্তব সমস্যাও থাকতে পারে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে ম্যাচ হিস্টোরিয়ার পেছনে এর মধ্যে রয়েছে মানসিক কারণ যেমন অতিরিক্ত উদ্বেগ পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানসিক দ্বন্দ্ব নিম্ন শিক্ষার হার নিম্ন অর্থ সামাজিক অবস্থান সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সদস্য কিংবা নির্যাতন বা ট্রমা রচিত অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন। তবে ,
মোটা দাগে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা যায় এগুলো হচ্ছে:
- শৈশবের নির্যাতনের শিকার হওয়া
- মানসিক উদ্বেগ বা বিষন্নতায় ভোগা
- সাম্প্রতিক কোনো মানসিক চাপ বা ট্রমার শিকার হওয়া।
- এবং সাম্প্রতিক কোন স্বাস্থ্য সমস্যা।
ম্যাস হিস্টিরিয়ায় লক্ষন
যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ম্যাচ হিস্টোরিয়ার লক্ষণ বিভিন্ন রকম হয়।এটা নির্ভর করে যে মস্তিষ্কের কোন অংশের কাজে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে সেটার উপর। তবে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেমন
খিচুনি
সাধারণত মস্তিষ্কের কোন অংশের গঠন বা কাজে বাধা তৈরি হলে খিচুনি হয়। হিস্ট্রিয়ার কারণেই যে খিঁচুনি তৈরি হয় তাকে সাইকোজেনিক নন এফিলেক্টিভ সিজার বলা হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এ ধরনের খিচুনি হয়।
ইন্দ্রিয়োর সমস্যা
মানুষের দেখাশোনা গন্ধ স্বাদ এবং স্পর্শ অর্থাৎ ইন্দ্রিয় জনিত কাজে বাধার সৃষ্টি হয় এতে করে কারো কারো ডাবল ভিশন থাকে বা একটি জিনিসকে দুটি দেখে টানেলের মত লম্বা গলি দেখে কানে কম শুনে শরীর অবশ হয়ে যায় বা শরীরে কোন কিছু স্পর্শ করলেও তা বুঝতে পারে না।
ব্যথা
হিস্টোরিয়া আক্রান্ত হলে মানুষ ব্যথা অনুভব করে। অনেক সময় অন্য স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে ব্যথা হয় আবার অনেক সময় শুধুই ব্যথা হয়। অস্বাভাবিক পেশির ব্যথা টান লাগা বা কাঁপুনি হিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত হলে মস্তিষ্কের যে অংশ মাংসপেশির নিয়ন্ত্রণে কাজ করে সেখানে ব্যাঘাত ঘটে বলে দেহের বিভিন্ন পেশীতে অস্বাভাবিক ব্যথা টান লাগা বা কাঁপুনি হতে পারে।
বেশির দুর্বলতা বা প্যারালাইসিস
কোন কিছু গিলতে না পারা বা ব্যাঘাত ঘটা মাথা ঘোরা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা শরীরে কোন শক্তি না পাওয়া। যাদের হিস্টোরিয়া থাকে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে তাদের উপসর্গ নিয়ে তারা তেমন একটা চিন্তিত নন। ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় লা-বেলা ইন্ডিফারেন্স। অর্থাৎ সুন্দর উদাসীনতা ।বিভিন্ন ধরনের মানুষিক এবং মেডিকেল থেরাপির সমন্বয়ে হিস্টোরিয়া রোগের চিকিৎসা করা হয়। অনেক সময় দীর্ঘ কাউন্সিলিংয়েরও দরকার হয়।
তাই এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত ।
0 মন্তব্যসমূহ