২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে কাতার নানামুখী সমালোচনার শিকার হয়েছে। অতীতের সকল বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের চেয়ে কাতার একটি বিষয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। আর তা হল বিশ্বকাপ আয়োজনের বাজেট। কাতার বিশ্বকাপ এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ। এই আসার আয়োজন করার জন্য কাতার প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ প্রায় 22 লক্ষ কোটি টাকা। প্রতিটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যাবহুল রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজনে এর ১০ ভাগের এক ভাগ টাকাও খরচ হয়নি। অনেকের মনেই প্রশ্ন হল কাতার যে এত বিপুল অর্থ খরচ করে বিশ্বকাপ আয়োজন করল এতে কাতারের কি লাভ হবে নাকি ক্ষতি? সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে আজকের খেলাধুলা পর্বে।
![]() |
| ২০২২ বিশ্বকাপ |
কাতার বিশ্বকাপের বাজেট
কাকার কি বিশ্বকাপ আজব দেশ নির্বাচন করা হয়েছিল এই বিশ্বকাপ শুরুর ১২ বছর আগে। তখন কাতারে ছিল একটি মাত্র স্টেডিয়াম। কিন্তু সেটি কোনভাবেই বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০১০ সালের পর থেকে কাতার বিশ্বকাপ উপলক্ষে নতুন সাতটি স্টেডিয়াম তৈরি করেছে। সেই সাথে আগের একটি স্টেডিয়াম কেউ এমন ভাবে সংস্কার করা হয়েছে যে তাকে নতুন স্টেডিয়াম বলাই ভালো।
বিশ্বকাপের খেলা দেখতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এক স্টেডিয়াম থেকে আরেক স্টেডিয়ামে যাবে। তবে যাকাত সহজ করতে গড়ে তোলা হয়েছে অত্যাধুনিক মেট্রোরেল ব্যবস্থা। এছাড়া বিশ্বকাপ উপলক্ষে বহু নতুন সড়ক নতুন নতুন হোটেল রিসোর্ট এবং পর্যটনসহ কাব্য কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। বিশ্বকাপ আয়োজনের যে ২২০ বিলিয়ন ডলার বাজেটের কথা বলা হয় তার সিংহভাগ গেছে এইসব অবকাঠামো নির্মাণে।
কিন্তু নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিশ্বকাপ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক ব্যয় ছাড়াও আরো বেশ কিছু অনানুষ্ঠানিক খাতে কাতারের অনেক অর্থ খরচ হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয় কাতার বিভিন্ন পাবলিক ফান্ডেই আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে। এর বাইরে ফিফার বিভিন্ন কর্মকর্তাকে তারা গোপনে কত টাকা ঘুষ দিয়েছে তার হিসেব বের করা অসম্ভব। এ ছাড়া আফ্রিকার দেশগুলো যেন কাতারের পক্ষে ভোট দেয় সেজন্য ২০১০ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফিগারেশনে কাতার বিপুল অর্থ সহায়তা দিয়েছিল। এর ফান সিস্টেম এবং জার্মানিকে কাতারের পক্ষে থাকার জন্য আর্থিকভাবে খুশি করতে হয়েছে।
তখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির প্রিয় ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্নিতে কাতার ৫০০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছে। স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনাকে পাঁচ বছরের জন্য কাতার ১৫০ মিলিয়ন ইউরো স্পন্সরসিপ দিয়েছে। এবং কাতারে স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে জার্মান কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের খরচ মিলিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য কাতারকে বেহিসাবি অর্থ খরচ করতে হয়েছে।
কাতারের লাভ না ক্ষতি
কাতার যত খরচ করেছে তার খুব সামান্য তারা তুলতে পারবে। দা ইকোনোমিস্টের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের মাধ্যমে কাতার প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মানে কাতারের ২০৩ বিলিয়ন ডলার লোক সংখ্যা হতে যাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে খরচ করা অর্থ ধরলে কাতারের পুরোটাই লস।
তবে কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজন কর্তৃপক্ষ বলছে যেসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে তা শুধু বিশ্বকাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বিশ্বকাপ শেষেও এগুলো কাজে লাগবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জনসংখ্যার দিক থেকে কাতার বিশ্বের ১৪৯ তম এবং আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের ১৬৫ তম দেশ।
কাতারের নিচে যে সব দেশ আছে সেগুলোর বেশিরভাগই অতি ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র। সে বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র এই দেশের জন্য এত এত স্টেডিয়াম এত হোটেল আর এত বিস্তৃত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের কোনই দরকার নেই।। কাকার তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আর সুকৌশলী ব্যবসায়িক পরিকল্পনার কারণে মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ধনী দেশে পরিণত হয়েছে। বিপুল অর্থবৃত্ত থাকলেও কাতারের একটি জিনিসের অভাব ছিল আর তা হল খ্যাতি।
বিশ্বকাপ আয়োজন করার মধ্য দিয়ে কাতার বিশ্বজোড়া পরিচিতি আর এক ধরনের সফটওয়্যার অর্জন করতে পেরেছে। যা সফলতার টাকা দিয়ে কেনা যায় না। টাকার জন্য সফলভাবে বিশ্বকাপ আসর শেষ করতে পারে তবে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব এবং ইরানের মত শক্তিশালী প্রতিবেশীদের চেয়েও কাতারের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে বিশ্বাস সামনে কাতারের সক্ষমতার ভাবমূর্তি অনেক বেশি উজ্জ্বল হবে।
বড় আয়োজন কেন লাভজনক হয় না?
বিশ্বকাপ ফুটবল এবং অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এ ধরনের বড় বড় আয়োজনে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। সুইজারল্যান্ড মিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে 1964 থেকে 2018 সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের মত ৩৬ টি বড় আয়োজনের মধ্যে ৩৩ টি আয়োজনই লাভজনক হয়নি। এই গবেষণা চৌদ্দটি বিশ্বকাপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
১৪ টির মধ্যে কেবলমাত্র একটি বিশ্বকাপ আয়োজন লাভ জনক ছিল। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ। ওই বিশ্বকাপে রাশিয়ার ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। এত বিপ্লব বিনিয়োগের বিপরীতে রাশিয়া মাত্র ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার মুনাফা করতে পেরেছিল। তাই বলতে গেলে বিনিয়োগের বিপরীতে এই মুনাফা খুব বেশি সন্তোষজনক হয়নি। বিশ্বকাপের প্রচার বিক্রি করেই রাশি মূলত সামান্য এই মুনাফা করেছিল। কিন্তু অন্যান্য দেশ তাদের বিশ্বকাপের খরচ মিলিয়ে এই সামান্য লাভের মুখে দেখতে পারে না।
বিশ্বকাপ আয়োজন করার মাধ্যমে একই দেশের যে শুধু আর্থিক ক্ষতি হয় তা নয় বিশ্বকাপ আসল যে একটি দেশের উপর কত বড় অভিশাপ বয়ে নিয়ে আসতে পারে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল ব্রাজিল। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে প্রায় 14 বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল। এটি ফিফা ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ।সেই আগুন থেকে ব্রাজিলের লাভ করার আশা থাকলেও শেষমেষ ব্রাজিলের ৬৭০ মিলিয়ন ডলার লোকসান হয়। বিশ্বকাপের টাকা জোগাড় করতে ব্রাজিলের জাতীয় বাজেট কমিয়ে ফেলা হয় এবং জনগণের ট্যাক্স বাড়ানোর সহ বহু কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।
যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বকাপ পরবর্তী সময়ে দেশটিতে ব্যাপক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এই বিপ্লব অপচয় না করে ব্রাজিল যদি তাদের দেশের অনাহারে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করত তাতেও দেশ দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হত। সাধারণত বিশ্বকাপের সময় সড়ক পরিবহনসহ পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে সে সড়ক সুফল পরবর্তীতেও পাওয়া যায়। কিন্তু স্টেডিয়ামের মত অকাজে বিষয়ের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করলে দেশের সাধারণ জনগণ তার থেকে কোনোভাবেই লাভবান হতে পারে না।
ফিফার ব্যবসায়িক মনোভাব
বিশ্বকাপ আয়জোক দেশ লাভবান হতে না পারার আরেকটি বড় কারণ হলো ফিফার ব্যবসায়িক মনোভাব। বিশ্বকাপ আয়োজন এর যত খরচ তার সব বহন করতে হয় আয়োজক দেশকে। ম্যাচ পরিচালনার ব্যয় বহন করে। কিন্তু বিশ্বকাপ থেকে যত টাকা আয় হয় তার সিংহভাগ নিয়ে নেয় ফুটবলার সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা। বিশ্বকাপ আশা করি ফিফার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। টাকা কামানোর সুযোগের সম্ভাবনা করতে বিন্দুমাত্র তার কর্ম করে না।
স্টেডিয়ামের টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্পনসর সিট খেলার মাঠের বিজ্ঞাপন এবং টেলিভিশন সম্প্রচার সাতটা পর্যন্ত সবকিছুই থাকে ফিফার হাতে। গত বিশ্বকাপ থেকে ফিফা ৫৪০ কোটি ডলার আয় করেছে। তবে স্বীকার খরচও দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে একজন ফুটবলের পিছনে ফিফার খরচ হয়েছিল মাত্র ২ লাখ ডলার। কিন্তু ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে খেলোয়াড় প্রতি ফিফার খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ লাখ ডলারে।
বিশ্বকাপকে আমরা নিখাদ বিনোদন মনে করলেও সেফার কাছে এটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। গুঞ্জন শোনা গেছে যে শেষ হয় তাদের মুনাফা বারাতে চার বছরের বদলে প্রতি দুই বছর পর পর ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চাই। আসলে সমস্যা টাকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে তারা নিজেদের পকেট ভারি করা ছাড়া আর কিছু বোঝেনা। সাংগঠনিক কার্যক্রমে এমন সব বিষয় চোখে পড়ে যা শুধু মাদক চরাকারবারি এবং মাফিয়া দের মধ্যেই দেখা যায়।
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ